গুপ্তচক্র(মাসুদ রানা ১৭)

guptochokro2গুপ্তচক্র তখনকার গল্প বলে যখন বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ। মাসুদ রানা তখনো পি.সি.আই এর,বি.সি.আই এর হয়নি। এই গল্পে সেই মাসুদ রানার দেখা মেলে যে তখনো এখনকার মত সুপারহিউম্যানে পরিণত হয়নি। এখনকার রানা যেমন যে কোন বিষয়,তা জিওলজি হোক আর আর্কিওলজি হোক, বিশেষজ্ঞ হয়। এই রানা সেরকম নয়। তাই তো রাহাত খান যখন তাকে ফুয়েল এক্সপার্ট এর ছদ্মবেশ নিতে বলে রানা অকপটে বলে সে তো এই সম্পর্কে কিছুই জানেনা। এমনকি রানা মনে মনে ভাবে বুড়োর মাথা একেবারেই বিগড়ে গেছে!!

গুপ্তচক্র মাসুদ রানা আর সোহানার প্রথম একত্রে মিশনের কাহিনী বলে। সোহানাও তখন এখনকার মত অতিমানবী নয়। সে তখন নিতান্তই এক সাধারন তরুণী। তাই তো রানা মনে মনে খুশি নয় সোহানাকে এই মিশনে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে।তার উপর এমনেই রানা সহ তার সব কলিগ তখন সোহানার উপর ক্ষেপা।তাদের মতে এই মেয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।তাকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ।এসবের মধ্যে যদি রানাকে সাথে নিতে হয় সোহানাকে!!তবে রাহাত খানের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধু রানা নয় খোদ রাহাত খানই সন্দিহান!সে মনে করে জীবনে প্রথমবারের মত ভুল সিদ্ধান্ত নিল না তো!

কাহিনী সংক্ষেপ-
মাসুদ রানার এক লক্ষ দেনমোহরে বিয়ে হয়ে গেল সোহানার সাথে,তাও আবার রানার অজান্তে!রাহাত খান দিয়েছেন।যদিও বিয়েটা নকল।তারপর রানা তার স্ত্রী সোহানাকে নিয়ে চলল তার নতুন কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে।সে এখন ফুয়েল এক্সপার্ট।পথে নানা বাঁধা পেরিয়ে দুজনে উপস্থিত হল ছোট্ট এক দ্বীপে।সেখানে পরিচয় হল আত্মভোলা এক প্রফেসর আর আদিম প্রকৃতির কোচিমার সাথে।সবকিছুই ভাল মনে হচ্ছে এখানে।কিন্তু রানার সন্দেহ যাচ্ছে না কেন?রাতে ঝোপঝাড় নড়ছে,সরছে,চোখের সামনে সংখ্যা কমে যাচ্ছে ঝোপঝাড়ের!রানা হঠাৎ নিজেকে আবিস্কার করল এক গুপ্তচক্রান্তের ভেতরে।

বইটি পড়া শুরু করার পরেই মুগ্ধ হওয়া শুরু।আশ্চর্য সাবলীল ভাষায় বর্ণনা।বইয়ের কাহিনী শুরু হয় সোহানার প্রতি অন্যদের বিষোদগার থেকে।সোহানা সবার শান্তি কেড়ে নিচ্ছে।অল্প কয়েকদিনেই সে হয়ে উঠেছে রাহাত খানের সবচেয়ে প্রিয়।তারই পরামর্শে রাহাত খান অনেক কাজ করে।যেমন রানাকে এক মাসের জন্য ট্রেনিংএ পাঠানো,কিংবা অন্যদের কবিতার বই পাঠানো।সব মিলিয়ে বেশ মজার সব মুহর্ত।যেহেতু রানা-সোহানার প্রথম মিশন তাই বেশ আগ্রহের সাথেই পড়া শুরু করেছিলাম এবং সঠিক প্রতিদানও পাচ্ছিলাম।রানা-সোহানার অম্ল-মধুর সম্পর্কও বেশ ভাল লাগছিল।তাই বেশ দ্রুতই পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল।কিন্তু বইয়ের মাঝপথে এসে আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়ল।কারন কাহিনী যেরকম ভাবছিলাম,মোড় নিচ্ছিল তার অন্যদিকে।তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আগ্রহ ফিরে পেলাম,আবার গতি পেল পড়া।

বইটিকে যদি কাল্পনিক দুই ভাগে ভাগ করা হয়,তবে নিঃসন্দেহে প্রথম অংশ অনেক বেশি উপভোগ্য।দ্বিতীয় অংশ অতটা উপভোগ্য না হলেও ভালই।তবে বইটির শেষ কয়েক পৃষ্ঠা আমার খুব একটা ভাল লাগেনি।হয়ত সে সময় মিস করেছি বর্তমানের সুপারহিরো রানাকে!যদিও তার আগে পুরোটা সময় এই পুরনো রানাকেই বেশ ভাল লাগছিল।আসলে শেষ কয়েক পৃষ্ঠায় রানার ভূমিকা খুবই কম ছিল,যা আমার মোটেও ভাল লাগেনি।তাছাড়া কাহিনী যেরকম ভেবেছিলাম তার অন্যদিকে মোড় নেওয়ার কথা তো আগেই বলেছি।তবে সব মিলে বইটা পড়ে সময়টা ভালই কেটেছে।

এই বইটি সব মিলিয়ে ভাল লাগলেও এরচেয়ে প্রিয় রানার বই আরও আছে আমার।কিন্তু তারপরেও এই বইটি আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে।কারন এটি রানা-সোহানার প্রথম মিশন আর বইটির দুর্দান্ত প্রথম অংশ।এছাড়া সবসময়ের প্রাপ্তি –আমাদের প্রিয় কাজী আনোয়ার হোসেন এর দুর্দান্ত লেখনী।তাই বলতে পারি যারা এখনো বইটি পড়েনি তাদের উচিৎ অতিদ্রুত বইটি পড়ে ফেলা।

এক নজরে-
বইয়ের নাম-গুপ্তচক্র
লেখক-কাজী আনোয়ার হোসেন
প্রকাশক-সেবা
প্রথম প্রকাশ-জুন,১৯৭০
প্রচ্ছদ-হাশেম খান
আমার রেটিং-৭/১০

এ স্মল টাউন ইন জার্মানি

A Small Town in Germanyথ্রিলার টাইপের এই উপন্যাসটি পড়ে খুব আনন্দ পেয়েছি। আমার কাছে  থ্রিলার বই মানে হলো প্রতিটি পাতায় থাকবে প্রচুর পরিমান উত্তেজনা এবং শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা। অনেক দিন পরে মনের মত একটি থ্রিলার পড়লাম। জন ল্য ক্যারের লিখা বই আগে আর পড়িনি। অসাধারন লিখেছেন লেখক। নেটে খুজতে, খুজতে ল্য ক্যারের আরো দুটি পেয়ে গেলাম। থ্রিলার টাইপের বই পড়তে যারা পছন্দ করেন তারা জন ল্য ক্যারে পড়ে দেখতে পারেন। হঠাৎ করেই নিখোজ হয়ে যায় ব্রিটিশ একজন লোক। সে কাজ করতো পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বনের ব্রিটিশ দূতাবাসে। হোমরা-চোমরা কেউ না। নিচের স্তরে কাজ করা সাধারন একজন কর্মচারি। ব্রিটিশ দূতাবাসের মাথা ব্যাথা হাড়িয়ে যাওয়া কর্মচারির জন্য না। লোকটির সাথে সাথে অনেক গুলো টপ সিক্রেট দলিলও গায়েব হয়ে যায় ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে। যে কোন মূ্ল্যে কাগজ গুলো ফেড়ত চাই ব্রিটিশ দূতাবাসের। না হলে চরম মূল্য দিতে হবে দূতাবাস। এবং খুব লজ্জার মধ্যে পরবে বৃট্রিস সরকার। ঘটনার তদন্ত করতে লন্ডন থেকে উড়িয়ে আনা হলো অ্যালান টার্নার নামের একজনকে। ভিঞ্চি-কোড বইটি যাদের ভাল লেগেছে তাদের অবশ্যই বইটি পড়ে দেখতে পারেন। বইটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বেঁচে যাওয়া নাৎসীরা আবার কিভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানোর জন্য কাজ শুরু করে, কিভাবে তারা সরকারের সাথে যোগসাজশ গড়ে তোলে, কিভাবে ব্যবসা–বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে তার একটা সাবলীল বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

তিন নম্বর চোখ(কিশোর কল্পবিজ্ঞান)

Kishor_Kalpobigyan_Samagra_সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এই নামটির সাথে পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু তার লেখার সাথে পরিচয় হয় বেশ পরে। মুলত ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে কাকাবাবু সমগ্র পড়ি। সেই ছিল প্রথম তার কোন লেখা পড়া। এরপর বিভিন্ন সময়ে তার অনেক লেখা পড়ার সুযোগ এসেছে। কিন্তু ২-১টি ছাড়া তেমন একটা পড়া হয়নি। আসলে আগ্রহ পাইনি। এর মধ্যে একদিন তার একটা বইয়ের নাম জানতে পারলাম। তিন নম্বর চোখ, একটি কিশোর কল্পবিজ্ঞান। কল্পবিজ্ঞান শুনেই মুলত আগ্রহ জন্মায়। এরপর তার অন্যান্য কল্পবিজ্ঞান নিয়েও খোঁজ করা শুরু করলাম। জানতে পারলাম আকাশ দস্যু, অন্ধকারে সবুজ আলো উপন্যাসের কথাও। এসব খোঁজের মাঝে একদিন তার লেখা “কিশোর কল্পবিজ্ঞান সমগ্র”  খুঁজে পেলাম। তারপর আর দেরি না করে পড়া শুরু করি তিন নম্বর চোখ।

সুজয়।ডাকনাম জয়।বার-তের বছরের এক ছেলে।এই জয়কে ঘিরেই তিন নম্বর চোখ বইয়ের কাহিনী।জয় তার বাবা,মা আর ছোড়দির প্রত্যেক বছর দূরদূরান্তে বেড়াতে যায়।এবার তারা জলগাঁও গিয়েছে।জয়ের মামাবাড়ি।দুই মামাত ভাইয়ের সাথে জয় বেশ আনন্দেই সময় কাটাচ্ছে।সারাদিন ক্রিকেট খেলা,ছুটোছুটি,হাসাহাসি করে তাদের দিন কাটচ্ছে।জয়কে ওর কাকাবাবুর দেওয়া এয়ার গান দিয়েছিল।সেটা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা।এসব পর্যন্ত ঠিকই ছিল।কিন্তু এরপর একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।তারপর থেকে জয়ের জীবনটাই বদলে গেল।

কাহিনী সংক্ষেপ-
ঘোড়ার আবার শিং হয় না কি!!কিন্তু জয় যে দেখল!তার দুই মামাত ভাই রাণা আর খোকন যে এ কথা মানতেই চায় না।তাই বাধ্য হয়ে ঘোড়ার গাড়িটিকেই থামায় ওরা।কিন্তু কোথায় শিং!শিং যে হাওয়া।উল্টো জয় দেখল,যে গাড়িটিতে একটু আগে ১ জন ছিল এখন কিভাবে যেন ২ জন এসে গেছে।কি করে এটা সম্ভব।এ কথা রাণা-খোকনদের বলতে তারা বলল লোক ১জনই ছিল,১জনই আছে!!তারা তো জয়ের উপর হেসেই অস্থির।কি হয়েছে জয়ের।ও কি পাগল হয়ে গেল,নাকি ও অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই দেখতে পায়!

একটু বিজ্ঞান আর অনেকখানি কল্পনা।এই দুই এর মিশেলেই তিন নম্বর চোখ।যদিও লেখাটিকে আমার ঠিক সায়েন্স ফিকশন মনে হয়নি।আসলে এর আগে জুল ভার্ন,মুহম্মদ জাফর ইকবাল,আইজ্যাক আসিমভ এদের লেখা পড়ে এসেছি।তাদের লেখা সায়েন্স ফিকশনের সাথে এই লেখার ধরন ঠিক মেলে না।উল্টো কাকাবাবুর উপন্যাসগুলোর লেখার স্টাইলের সাথে তিন নম্বর চোখের কিছুটা মিল আছে!(এটাই তো স্বাভাবিক)তবে তা বলে লেখাটি পড়ার মজা বিন্দুমাত্র কমে না।লেখাটি পড়ার সময় বেশ অন্য ধরনের একটি আনন্দ পেয়েছি।তাই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বেশ দ্রুতই পড়েছিলাম।

মাত্র ৫৬ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস।উপন্যাস না বলে হয়ত উপন্যাসিকা বললেই ঠিক হত।কিন্তু এই ছোট লেখাটিতেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর চমৎকার লেখনী ফুটে উঠেছে।লেখাটি ছোট হলেও দুর্দান্ত এ কথা বলা চলে।কিন্তু সমস্যা হল লেখাটি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল।অন্তত আমার কাছে তাই মনে হল।লেখাটি আরেকটু বড় হতেই পারত।কাহিনী যেভাবে এগোচ্ছিল তাতে আরও কিছু আশা করাটা অন্যায় নয়।লেখাটি যে সকল চরিত্র,ঘটনা দিয়ে সাজানো হয়েছে তাতে আরও জমজমাট কিছু দিয়ে লেখাটি শেষ হবে আশা করেছিলাম।কিন্তু এ দেখি ছোট গল্পের মত আশা জাগিয়েই শেষ।এসবের কারনে আমার মনে কিঞ্চিৎ হতাশা থাকলেও তাতে লেখাটির আবেদন কমে যায় না।লেখাটি মুলত কিশোরদের জন্য লেখা হলেও আমার মতে সকল বয়সী পাঠকই পড়তে পারে।

এক নজরে
উপন্যাসের নাম-তিন নম্বর চোখ।
বইয়ের নাম-কিশোর কল্পবিজ্ঞান সমগ্র।
লেখক-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
প্রকাশক-পত্র ভারতী।
আমার রেটিং-৩.৭৫/৫

নেক্সাস(জেফরি-বাস্টার্ড ৩)

nexusবইটি শুরু হয় খুবই সাধারণ ভাবে। অন্তত সিরিজের প্রথম দুইটি বইয়ের তুলনায়। জেফরি-বাস্টার্ড সিরিজের তৃতীয় বই এটি। সিরিজের প্রথম দুইটি বই নেমেসিস আর কন্ট্রাক্ট। এর মধ্যে কন্ট্রাক্ট তো শুরু হয়েছিল বেশ উরাধুরা, তারছিঁড়া স্টাইলে। সে তুলনায় নেক্সাস বেশ সাধারণ ঘটনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়। কিন্তু সে সাধারণ রূপের মধ্য দিয়েই সামনের অসাধারণ ঘটনার সুত্রপাত হয়েছে তা কিছুদুর গেলেই বোঝা যায়। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পরেই কাহিনী যে দিকে আগাতে শুরু করে তা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে বাধ্য।

কাহিনী সংক্ষেপ-
হাসান। নিরীহ, গোবেচারা, কারো সাতেও নেই পাঁচেও নেই টাইপের লোক। আর তাকেই কি না খুন করা হল এমন নিষ্ঠুর ভাবে। আর সে খুন হয়ে ঝামেলায় ফেলে গেল জেফরি বেগ আর জামানকে! তদন্তে নেমে তারা তো কূলই পাচ্ছে না। নিতান্ত এক সাধারণ লোক হাসান। রাজধানীর এক অভিজাত স্কুলের জুনিয়র ক্লার্ক ছিল। না ছিল তার কোন শত্রু, না ছিল বন্ধু। এরকম লোককে খুন করবেই বা কে! তাদের ঝামেলা এখানে থামলে না হয় কথা ছিল। এর মধ্যে যোগ দিল এক সন্ত্রাসীচক্র। তারপর—

জেফরি বেগ ধরার চেষ্টা করছে এক লোককে। কিন্তু পারছে না। সে জেফরির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। না বাস্টার্ড এর কথা বলছি না। আরেকজনের কথা বলছি। জেফরিকে এই লোক বারবার বাস্টার্ডকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। বাস্টার্ড এর পর এই আরেকজন যে তাকে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে। জেফরি মাঝে মাঝে এই লোককে বাস্টার্ড এর চেয়েও এগিয়ে রাখছে। বলছি বইটির অন্যতম চরিত্র মিলন এর কথা। চরিত্রটিকে মাঝে মাঝে কিছুটা ফিল্মি আর বিরক্তিকর লাগলেও সব মিলিয়ে বেশ ভালই লেগেছে বলতে হবে।

জামান।এই সিরিজের অন্যতম এক চরিত্র।সিরিজের প্রথম থেকেই তার গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি।জেফরির সর্বক্ষণের সাথী সে।বেশ যোগ্যতাসম্পন্ন এই ছেলেটি জেফরিকে বেশ শ্রদ্ধা করে,ভালবাসে।হয়ত জেফরির চরিত্রের বিশালতার কারনে এই সিরিজে সে নিজেকে ততটা মেলে ধরতে পারেনি।এরপরেও এই সিরিজের আমার অন্যতম একজন প্রিয় চরিত্র সে।এই সিরিজে আমার প্রিয় চরিত্রের তালিকা করলে জেফরি,বাস্টার্ড এর পরেই সে থাকবে।

এই বইটি তার সব বিভাগেই বেশ ভাল নাম্বারই পাবে।বইটির মধ্যে যে রহস্য বর্ণিত হয়েছে তা প্রায় শেষ পর্যন্ত লেখক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।কাহিনি বেশ কয়েকবার দিক,রঙ,গতি বদলেছে।কিছু জায়গায় কিছু অসঙ্গতি কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।যেমন একটি প্রশ্ন হল ১৫ বছরের একজন ছেলের নামে কি করে একটি সিমের রেজিস্ট্রেশন হয়!?!এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে খামতি থাকলেও সব মিলিয়ে বেশ ভালই বলতে হবে।তবে যদি বইটির সত্যিকারের খামতির কথা বলতে হয় তাহলে সেটা হবে(আমার একান্ত নিজস্ব ভাবনা।অন্যদের সাথে নাও মিলতে পারে) বাস্টার্ড।না সে কিছু উল্টাপাল্টা করেনি।করবে কি করে!তাকে খুঁজে পাওয়াই তো দুস্কর হয়ে পড়েছিল।সেই বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে তাকে খুঁজতে শুরু করেছিলাম।কিন্তু সে গেল কই!!বইয়ের মাঝামাঝি একবার সে এল,কিন্তু মুহূর্তেই মাঝেই আবার হারিয়ে গেল।না একেবারেই আশাহত করেনি সে।বইয়ের শেষের অনেক আগেই সে দৃশ্যপটে চলে আসে।তারপর তার আগের অনুপস্থিতি অনেকটাই পুষিয়ে দিয়েছে।যদিও সেটুকুতে কি আর আমার মন ভরে!

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন এর মৌলিক থৃলার।আমার মত যে কোন পাঠকের জন্য এই একটি কথাই যথেষ্ট বইটি পড়ার জন্য।তার উপর বইটি হয় যদি আবার জেফরি-বাস্টার্ড সিরিজের বই।এই সিরিজের প্রথম দুইটি বই পড়া হয়েছিল কয়েক মাস আগে।আর পড়ে অসম্ভব ভাল লেগেছিল।তাই বইটি পড়ার আগে অনেক প্রত্যাশা ছিল।সে প্রতাশা অনেকাংশে পূরণ হলেও আমি আগের দুইটি বই এর চেয়ে নেক্সাসকে কিছুটা পিছিয়ে রাখব।তার মানে এই নয় বইটি আমার ভাল লাগেনি।বইটি আমার প্রচণ্ড ভাল লেগেছে।

জেফরি বেগ সিরিজে এর পরে আরও একটি বই আছে।কনফেশন।কে জানে আমার জন্য সে কি নিয়ে অপেক্ষা করছে।খুব শীঘ্রই বইটি পড়া শুরু করব।এছাড়াও এই সিরিজের আরও বেশ কয়েকটি বই বের হবার কথা রয়েছে।অপেক্ষায় রইলাম সেগুলোর।নাজিম ভাইয়ের প্রতি অনুরোধ রইল পাঠকদের খুব বেশি অপেক্ষায় না রেখে সিরিজের পরবর্তী বই দ্রুত বের করার।আশা করি তিনি এই অনুরোধ রাখবেন।

এক নজরে
বইয়ের নাম-নেক্সাস
সিরিজ এর নাম-জেফরি-বাস্টার্ড
লেখক-মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
প্রকাশক-বাতিঘর প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ-ফেব্রুয়ারি বইমেলা,২০১২
প্রচ্ছদ-সিরাজুল ইসলাম নিউটন
গায়ের মূল্য-৩০০ টাকা
আমার রেটিং-৪.২৫/৫

দ্য এইট

The-Eightবইটির ব্যাককভারে লেখা আছে,“দ্য দা ভিঞ্চি কোড পড়ে যেসব পাঠক রোমাঞ্চিত হয়েছেন বহুস্তরবিশিষ্ট সিক্রেটের দ্য এইট পড়ে আরেকবার মুগ্ধ হবেন তারা”।বইটি পড়তে পড়তে বারবার আমি এই কথাটার সার্থকতা উপলব্ধি করেছি।সত্যিই আমি মুগ্ধ হয়েছি।কাহিনী যত এগিয়েছে এই মুগ্ধতা বেড়েছে,বিন্দুমাত্র কমেনি।

বাস্তবিকই বহুস্তরবিশিষ্ট কাহিনী বলতে যা বোঝায় দ্য এইট তাই।বইটিতে মূলত বর্ণিত হয়েছে দুই সময়ের দুটি কাহিনী যা বইয়ের শেষে এসে মিলিত হয়েছে এক বিন্দুতে।দুটো কাহিনীই সমান্তরালভাবে চলেছে।একটি কাহিনীর শুরু ১৭৯০ সালে,অন্যটির ১৯৭২ সালে।এই দুই সময়ের দুই কাহিনীর কেন্দ্রে রয়েছে দুই নারী।১৭৯০ সালে শুরু হওয়া কাহিনীতে মিরিয়ে,আর ১৯৭২ সালের কাহিনীতে ক্যাথারিন।মূলত তাদের ঘিরেই কাহিনী আবর্তিত হয়েছে।আর এই ভিন্ন সময়ের ভিন্ন চরিত্রের দুই নারীকে সংযুক্ত করেছে একটি অভিন্ন জিনিস,একটি দাবাবোর্ড।শার্লেমেইনের কিংবদন্তীতুল্য দাবাবোর্ড যার মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছর আগের এক শক্তিশালী এবং বিপদজনক সিক্রেট ফর্মুলা।

এই সিক্রেট ফর্মুলা জানার জন্য হাজার হাজার বছরে চেষ্টা করেছে হাজার হাজার মানুষ।যাদের মধ্যে রয়েছে নেপোলিয়ন,নিউটন,পিথাগোরাস,ক্যাথারিন দি গ্রেট,রিশেলু,রুশো,ভলতিয়ার সহ আরও অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তি।এই ফর্মুলা জানতে হলে পেতে হবে সেই দাবাবোর্ড আর তার ঘুঁটি।

১৭৯০ সাল—
এই কাহিনী শুরু হয় মন্তগ্লেইন অ্যাবি থেকে যেখানে নান হবার অপেক্ষায় আছে দুই এতিম খালাত বোন ভ্যালেণ্টাইন এবং মিরিয়ে।সেসময় বসন্তকাল চলছে।হঠাৎ অ্যাবিস অ্যাবির সব নানকে ডেকে পাঠায়।তাদের তিনি জানান তাদের এখানে মাটির নিচে আছে শার্লেমেইনের কিংবদন্তীতুল্য দাবাবোর্ড।এই দাবাবোর্ডের গোপনীয়তা তখন হুমকির মুখে।তিনি তাই সিদ্ধান্ত নিলেন দাবাবোর্ডটি মাটি থেকে তুলবেন।তারপর তার সব ঘুঁটি ছড়িয়ে দিবেন বিভিন্ন জায়গায়।নানদের উপর দায়িত্ব পড়ে কাজটি করার।তাদের জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করতে হবে এগুলোকে।

১৯৭২ সাল—
২৩ বছর বয়সী ক্যাথারিন ভেলিস।সে কম্পিউটার,গণিত ও সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ।সে না চাইলেও জড়িয়ে পড়ে এই দাবাবোর্ড আর তার রহস্যের সাথে।সে কাজ করে একটি সিপিএ ফার্মে,যেখানে সে প্রথম নারী হিসেবে নিযুক্ত হবার সম্মানে সম্মানিত।কাজের সুত্রে তাকে যেতে হয় আলজেরিয়ায় যেখানে রয়েছে রহস্যের চাবিকাঠি।

দ্য এইট এর লেখিকা ক্যাথারিন নেভিল।ভাবতে অবাক লাগে তিনি কিভাবে এত জটিল একটা প্লটের বই লিখলেন।উভয় কাহিনীতেই রয়েছে অসংখ্য চরিত্র যেখানে একই সাথে ঘটে চলেছে অসংখ্য ঘটনা।সেসব ঘটনা আর চরিত্রের হিসেব রাখতে আমিই পড়তে গিয়ে হিমশিম খেয়েছি।তিনি সেখানে কিভাবে সব হিসেব রেখে লিখলেন!উভয় কাহিনীতে দেখা যায় দুটি দল খেলছে যেখানে একদল ভাল,একদল খারাপ।আর দুটি দলের মানুষ সেখানে ঘুঁটি।হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে এই খেলা,যে খেলা ঘিরে রচিত হয়েছে অজস্র ষড়যন্ত্র।মিরিয়ে আর ক্যাথারিন উভয়ই প্রথমে মনে করে তারা এই খেলায় সামান্য সৈনিক।পরবর্তীতে তারা আবিস্কার করে তারা মোটেও সাধারণ নয়,বরং তারাই এই খেলার মূল খেলোয়াড়।

প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি থৃলার।কিন্তু পড়ার সময় বিন্দুমাত্র বিরক্তিকর কিছু পাইনি।প্রতিটি পৃষ্ঠা আগ্রহের সাথে উল্টাতে বাধ্য হয়েছি।লেখিকা পুরোটা সময় আমার আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছেন।আর বইটির শেষ অংশতো সবচেয়ে উপভোগ্য।বইটির শেষে তিনি যে টুইস্টটি এনেছেন তা এক কথায় অনবদ্য।এই টুইস্টটিই দুই সময়ের দুই কাহিনীর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।বইটির একেবারে শেষে না আসা পর্যন্ত আমি ব্যাপারটা ধারনা করতে পারিনি,যদিও ব্যাপারটির একটি ক্লু অনেক আগেই ছিল।

বইটি আমার কাছে যে এত উপভোগ্য হয়েছে তার কৃতিত্ব একা লেখিকার নয়।এই কৃতিত্বের সমান ভাগীদার অনুবাদকও।আর বইটির অনুবাদক আমাদের সবার প্রিয় মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন।তিনি বইটিতে অসাধারণ কাজ করেছেন।এত বিশাল ক্যানভাসের একটি জটিল লেখাকে তিনি যেভাবে সাবলীল ভাষায় অনুবাদ করেছেন তা প্রশংসার দাবিদার।যদিও কিছু নগণ্য জায়গায় অনুবাদ চোখে লেগেছে।যেমন তিনি কেমনে না লিখে কিভাবে,চলেন না লিখে চলুন লিখতে পারতেন।এটি অবশ্য একান্তই আমার ব্যাক্তিগত মতামত আর তেমন কোন ভুলও নয়।আর তিনি যে সুবিশাল কাজ করেছেন,এসব উপেক্ষা করা যায়।কিন্তু বইটির বিভিন্ন অংশে যে অজস্র বানান ভুল রয়েছে তা উপেক্ষা করা যায় না।

বইটির নাকি ফায়ার নামক একটি সিকুয়েল আছে।যদিও সেটি প্রথমটার মত এত বিখ্যাত নয়।তারপরেও আমার ফায়ার পড়ার অত্যন্ত আগ্রহ রয়েছে।আশা করি ভবিষ্যতে বাতিঘর আর মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন মিলে আমাদের দ্য এইট এর মতই ফায়ার এর একটি মানসম্পন্ন অনুবাদ উপহার দিবেন।সেই দিনটির অপেক্ষায় থাকব।

এক নজরে
বইয়ের নাম-দ্য এইট
লেখিকা-ক্যাথারিন নেভিল
অনুবাদক-মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
অনুবাদ প্রকাশক-বাতিঘর প্রকাশনী
অনুবাদ প্রকাশকাল-সেপ্টেম্বর,২০১১
প্রচ্ছদ-দিলান
গায়ের মূল্য-৪৫০ টাকা
আমার রেটিং-৪.৫/৫

পরিশেষে বলতে পারি যারা এখনো বইটি পড়েননি পড়ে ফেলুন,বিন্দুমাত্র হতাশ হবেন না।

সাম্ভালা ট্রিলজি

সাম্ভালা ট্রিলজি

বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রামের মধ্যে অতি সাধারন এক গ্রাম।কাহিনীর শুরু হয় সেখান থেকেই।কিন্তু এই অসাধারন কাহিনী আটকে থাকেনি ঐ সাধারন গ্রামে।আটকে থাকেনি সময়ের বেড়াজালেও।বাংলাদেশের নানা জায়গা থেকে বিশ্বের নানা স্থানে পৌঁছে গেছে কাহিনীর পরিধি,পৌঁছে গেছে বর্তমান থেকে সুদূর অতীতে।

কাহিনী সংক্ষেপ-
একটি শব্দ-যাকে ঘিরে আবির্ভূত হচ্ছে রহস্য।“সাম্ভালা”।কি এই সাম্ভালার অর্থ?এটা কি কোন জিনিসের নাম?কোন জায়গার নাম?কোন মানুষের নাম?কোন জাতির নাম? নাকি অন্য কিছু!বেশ কিছু মানুষ নেমেছে এই সাম্ভালার খোঁজে।তবে প্রত্যেকেরই উদ্দেশ্য ভিন্ন।

সাম্ভালা-
অদ্ভুত এক লোক।হাজার বছর ধরে পথ চলছে সে।অন্যদিকে এক শয়তানের সাধক আর তার একনিষ্ঠ বাহিনী।আর সাধারণ ছেলে রাশেদ।নিজ বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে।পিছনে লেগেছে পুলিশ।শুধু পুলিশ নয় তার বন্ধুকে যারা মেরেছে তারাও তাকে খুঁজছে।

সাম্ভালা দ্বিতীয় যাত্রা-
হাজার বছরের পরিব্রাজক নেমেছেন সাম্ভালার সন্ধানে।তার পিছে লেগেছে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী।আবার ডঃ কারসন এবং ডঃ আরেফিনও নেমেছেন সাম্ভালার খোঁজে।অন্যদিকে রাশেদের যেন বিপদ পিছু ছাড়ছে না।জড়িয়ে পড়েছে গুপ্তধন উদ্ধারে।বন্ধুকে বাঁচাতে হলে তাকে খুঁজে বের করতেই হবে ঐ গুপ্তধন।

সাম্ভালা শেষ যাত্রা-
সাম্ভালার খোঁজে তিব্বতে এসে উধাও ডঃ আরেফিন।তাকে খুঁজে বের করতে বন্ধুকে নিয়ে রাশেদও হাজির হল তিব্বতে।কিন্তু সে জানেনা তাদের পিছনে পিছনেই চলেছে বিপদ।পরিব্রাজক লখানিয়া সিংও আছেন সাম্ভালার খোঁজে।কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বীও তার থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই।

এই সিরিজটি পড়ার সময় বা পড়া শেষে প্রথম যে ভাবনাগুলো মাথায় আসে তার মধ্যে অন্যতম হল এই সিরিজটাকে কোন জেনারে ফেলা যায়।কখনো মনে হবে ফ্যান্টাসি,কখনো এডভেঞ্চার।আসলে এই সিরিজটি ফ্যান্টাসি,অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার,থৃলার,গুপ্তধন,সিক্রেট সোসাইটি সব কিছুর সংমিশ্রণের একটি অনন্য উদাহরণ।অনেক সময় এতকিছু একত্রে আনতে গিয়ে অনেক লেখক একটা জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেন।কিন্তু এক্ষেত্রে লেখক বিন্দুমাত্র ভুল করেননি।সব মিলিয়ে একটি চরম উপভোগ্য লেখা উপহার দিয়েছেন।

লেখক শরীফুল হাসান এর কয়েকটা গল্প পড়া ছিল শুধু,যেগুলো মূলত থৃলার গল্প সংকলন ১,২ এ ছিল।সেই গল্পগুলো পড়ে ভাল লেগেছিল।আর সাম্ভালা সিরিজের কথা যে কতবার বিভিন্ন মানুষের কাছে শুনেছি,কত প্রশংসা শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই।তাই সব মিলিয়ে সাম্ভালা পড়ার জন্য বেশ আগ্রহ ছিল।এখন পড়ার শেষে বলতে পারি বিন্দুমাত্র হতাশ হতে হয়নি।

শরীফুল হাসান এর প্রথম মৌলিক উপন্যাস সাম্ভালা।আর প্রথম লেখাতেই তিনি যে জটিল প্লট নিয়ে কাজ করেছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।আসলে এধরনের বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের কোন লেখকই আগে লেখেননি।তিনিই প্রথম লিখেছেন।আর কাহিনীর পরিধিও সুবিশাল।একসাথে অনেকগুলো ঘটনা তিনি বর্ননা করে গিয়েছেন।অনেকগুলো চরিত্রের কথা পাশাপাশি বলেছেন।এক কথায় বলতে তিনি একটি বহুস্তরবিশিষ্ট কাহিনী আমাদের শুনিয়েছেন।ভাবতে অবাক লাগে এতসব ঘটনা,চরিত্র তিনি কিভাবে মাথায় রেখে লিখেছিলেন।আমি মাঝেমাঝেই সময়,কাল,চরিত্রের খেই হারাচ্ছিলাম।কিন্তু তিনি খেই হারাননি।যথেষ্ট দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে কাহিনীকে এগিয়ে গিয়েছেন পরিণতির দিকে।

সাম্ভালা প্রথম পর্বে লেখকের লেখনী কিছুটা দুর্বল বলা চলে।কিন্তু দ্বিতীয় এবং শেষ যাত্রার ক্ষেত্রে তা বলা যাবেনা।দ্বিতীয় এবং শেষ যাত্রায় এসে লেখকের লেখার ভাষা পেয়েছে সাবলীলতা,প্রাঞ্জলতা,আর কাহিনী পেয়েছে গতি।প্রথম পর্বে এছাড়াও তিনি সময় ব্যাবধানে কিছুটা ভুল করেছেন।যেমন এক জায়গায় দেখা যায় একদিনের মধ্যেই তিনি প্রথমে সকালের ঘটনা লিখে,তারপর রাতের ঘটনা লেখার পর আবার ফিরে গিয়েছেন দিনের ঘটনায়।

সিরিজটিতে একই সাথে ঘটে চলেছে অজস্র ঘটনা।কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘটনাগুলোর পিছনে যে যুক্তি,যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট দুর্বল মনে হয়েছে।কোন কোন ক্ষেত্রে কোন ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়নি।যেমন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি রাশেদ কিভাবে তিন তিনবার তিনতলা থেকে লাফ দিয়েও অক্ষত থাকে।শেষবার অবশ্য একটু পা মচকেছিল!সিরিজের আরেকটি খামতির জায়গা হল কিছু কিছু জায়গায় ডিটেইলিংস এর অভাব।যেমন প্রথম পর্বের এক জায়গায় দেখা যাবে রাশেদ সি.এন.জি তে।তাকে ধাওয়া করা হয়েছে।কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে রাশেদ সেখান থেকে রক্ষা পেয়েছে।কিন্তু কিভাবে পেয়েছে সে সম্পর্কে শুধু বলা হয়েছে সি.এন.জি চালকের দক্ষতায় সে বেঁচেছে।আর কিছু বলা হয়নি।

যে ব্যাপারটা পুরো সিরিজে সবচেয়ে চোখে লেগেছে তা হল বেশকিছু অসঙ্গতি।আর অবাক করার ব্যাপার হল প্রথম পর্বে এগুলো খুবই কম ছিল,দ্বিতীয় এবং শেষ যাত্রায় প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গিয়েছিল।আমি সবগুলো বলতে গেলে হয়ত স্পয়লার হয়ে যাবে।তাই শুধু ৩ টি উদাহরণ দিচ্ছি।দ্বিতীয় যাত্রার ১৭১-১৭২ পৃষ্ঠা পড়ার সময় এক জায়গায় দেখা যাবে রাশেদ মোবাইল বের করে সময় দেখছে।পরের মুহূর্তেই দেখা যাবে সাথে মোবাইল না থাকায় সে কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না!!আর বইটির বেশকিছু জায়গায় বিনোদ চরিত্রটিকে আকাশ বলা হয়েছে।আবার শেষ যাত্রায় কিছু জায়গায় একটি চরিত্রের নাম কখনো চরনদাস কখনো রামচরন বলা হয়েছে।

এসব মাইনাস পয়েন্ট দেখে মনে হতে পারে বইটা আমার ভাল লাগেনি।কিন্তু আগেই বলেছি বইটা আমার ভাল লেগেছে,সত্যি বলতে কি দুর্দান্ত লেগেছে।আর এই মাইনাস পয়েন্টগুলো সংখ্যায় নগণ্য।বইটির প্লাস পয়েন্টই বেশি।বইটির সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হল আপনি একবার পড়া শুরু করলে শেষ পর্যন্ত পড়তে বাধ্য।আপনি প্রথম পর্ব শেষ করলে এটি আপনাকে বাধ্য করবে দ্বিতীয় পর্ব হাতে না আসা পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে।বাধ্য করবে হাতে আসা মাত্র পড়া শুরু করতে।

ট্রিলজিটি সব মিলিয়ে ৮০০ পৃষ্ঠার মত।আমি প্রত্যেকটি বইই এক বসায় শেষ করেছি।কারন একবার শুরু করার পর না শেষ করে উঠতে ইচ্ছে করছিল না।লেখক প্রায় পুরো সময়ই রহস্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।কেউ প্রথম পর্ব শেষ করার পর বিন্দুমাত্র ধারনা করতে পারবে না দ্বিতীয় পর্বে কাহিনী কোনদিকে এগোবে।তবে প্রথম দুইটি পর্ব পড়ার পর মনে বেশ কিছু প্রশ্ন জাগে।ট্রিলজিটা শেষ হবার পর অনেক প্রশ্নের যেমন যথাযথ উত্তর মিলেছে তেমনি পাওয়া যাবে না অনেক প্রশ্নেরই উত্তর।

বাতিঘরের বই পড়তে গেলে আমার মাথায় প্রথম যে কথাটা আসে,এই প্রকাশনীর সম্ভবত কোন প্রুফরিডার নেই!কারন তাদের আমি যে কয়টি বই পড়েছি তাতে রয়েছে বাড়াবাড়ি ধরনের বানান ভুলের মিছিল।এই সিরিজটিতেও রয়েছে বানান ভুলের অজস্র উদাহরণ।তবে বিস্ময়করভাবে এই সিরিজটিতে আমার মনে হয়েছে তুলনামূলক বানান ভুল কম রয়েছে।যাই হোক এর ফলে বইগুলোর মাহাত্য বিন্দুমাত্র কমে না।

বাতিঘর প্রকাশনীকে অজস্র ধন্যবাদ আমাদের এই মানসম্পন্ন মৌলিক লেখা উপহার দেবার জন্য।তারা গত কিছু সময় ধরেই অনুবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন মৌলিক লেখা প্রকাশ করে চলেছে।যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।তবে এই সিরিজটির জন্য প্রকৃত ধন্যবাদ প্রাপ্য শরীফুল হাসান এর।প্রত্যেকটি পর্বই তিনি অত্যন্ত যত্নের সাথে এবং পরিশ্রম করে লিখেছেন বোঝা যায়।সিরিজটির লেখার জন্য তিনি অনেক গবেষণা করেছেন তার পরিস্কার ছাপও তার লেখায় পাওয়া যায়।আশা করি এধরনের আরও অনেক মৌলিক লেখা তার কাছ থেকে ভবিষ্যতে পাব।

এক নজরে
বইয়ের নাম-সাম্ভালা ট্রিলজি
লেখক-শরীফুল হাসান
প্রকাশক-বাতিঘর প্রকাশনী
প্রকাশকাল-বইমেলা ২০১২,২০১৩,২০১৪
গায়ের মূল্য-২০০+২২০+২৪০ টাকা
আমার রেটিং-৪.২৫/৫

পরিশেষে বলতে পারি যারা এখনো ট্রিলজিটি পড়েননি পড়ে ফেলুন,বিন্দুমাত্র হতাশ হবেন না।

আমিই রানা[মাসুদ রানা ৭০,৭১]

ami-e-rana

বইটি পড়া হয়েছে আরও বেশ কয়েকদিন আগে।ঐ যে যেদিন তিন গোয়েন্দার নাটকের(!) প্রথম পর্ব প্রচারিত হয়েছিল সেদিন।ঐ দিনই একটা রিভিউ লেখার ইচ্ছে ছিল।কিন্তু ঐ নাটক দেখার পর আমার মধ্যে যে আবেগের জোয়ার উঠেছিল তাতে রিভিউ সহ সবকিছু ভেসে গিয়েছিল!!তাই আজকে রিভিউ লিখে পোস্ট করছি।

কাহিনী সংক্ষেপ-
একি তেলেসমাতি কাণ্ড,একি ভানুমতির খেল!মাসুদ রানা ছিল তেল আবিবে।ঘুম থেকে উঠে নিজেকে পায় নরওয়ের এক হোটেলে।তাও না হয় মানা যেত।কিন্তু ওতো ভয়ে আয়নার কাছেও যেতে চাচ্ছে না।বেচারার চেহারাই কিভাবে যেন বদলে গেছে!কি সুন্দর চেহারা ছিল তার।আর এখন এক আধবুড়া বিদঘুটে চেহারার মালিক সে।স্মৃতিও প্রতারণা করছে তার সাথে।নিজের নাম মাসুদ রানা আর সে একজন দেশপ্রেমিক ইসরাইলি!!এটুকুই শুধু মনে আছে।অন্যদিকে বেশ কয়েকটি দেশ পেতে চাচ্ছে তাকে।ঐ সব দেশের লোক লেগেছে তার পিছনে।শুরু হল তাদের সাথে রানার এক অন্যরকম ইঁদুর-বিড়াল খেলা।

প্রথমেই বলতে হচ্ছে এর চেয়ে ঢের ভাল মাসুদ রানা পড়েছি আমি।তাই বলে একেবারে খারাপ ভাববেন না।“আমিই রানা”কে ভালই বলতে হবে আর পড়ে বেশ মজাও পাওয়া যায়।বিশেষ করে কিছু জায়গায় মাসুদ রানার কাণ্ডকারখানা প্রচণ্ড উপভোগ্য।কাহিনীর ক্ষেত্রে বলা যায় বেশ অভিনব।তবে প্রথম খণ্ডের বেশ আগেই আমি পুরো বইয়ের কাহিনী সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারনা করে ফেলি।কিভাবে কি হয়েছে সেটুকু অবশ্য ধরতে পারিনি।তখন অপেক্ষা করছিলাম শেষে গিয়ে আমার ধারনা কতটুকু ঠিক হয় আর কিভাবে কি হয় তা জানার।শেষে দেখা গেল আমার ধারনার ৮৫-৯০%ই মিলে গেছে!!!

বইটির বর্ণনা বেশ সাবলীল,প্রাঞ্জল।আসলে এটি না হবার কোন কারণও নেই।কারন লেখক আমাদের সবার প্রিয় কাজী আনোয়ার হোসেন।তার অনবদ্য লেখনিতে কাহিনী বেশ তরতরিয়েই এগিয়ে যায়।ফলে পড়ার গতিও কোন জায়গায় তেমন একটা হোঁচট খায় না।কিছু জায়গা বিরক্তিকর আর কিছু জায়গায় বর্ণনা অতিরিক্ত লাগলেও সব মিলিয়ে বেশ ভালই বলতে হবে।পুরো বইয়ের মধ্যে আমার সবচেয়ে অপছন্দের জায়গা সম্ভবত ক্লাইম্যাক্স।এই বইটিতে এমন সব উপাদান,চরিত্র,মালমশালা ছিল যার ফলে ক্লাইম্যাক্সকে বেশ জমজমাট করা যেত।কিন্তু শেষটাকে উল্টো আমার কিছুটা পানসে মনে হয়েছে।

সবশেষে একটি চরিত্রের কথা উল্লেখ না করলেই নয়।গুস্তাভ তাতা।আহারে বেচারা!তার কপালে শেষ পর্যন্ত এই ছিল।নিয়তি তার সাথে এটা কিভাবে করল!!এর চেয়ে তো তার মরে যাওয়াও ভাল ছিল!!!

এক নজরে-
বইয়ের নাম-আমিই রানা।
লেখক-কাজী আনোয়ার হোসেন
প্রকাশক-সেবা
প্রথম প্রকাশ-১৯৭৯।
প্রচ্ছদ-আলীম আজিজ।
আমার রেটিং-৭/১০

১৯৫২-নিছক কোন সংখ্যা নয়…

1952

মনে করুন আপনি একটি গাড়িতে বসে।গাড়িটি চলছে কোন পাহাড়ি রাস্তায়।একটু পর পর অজানা তীক্ষ্ণ বাঁক।এরপরেও গাড়ির গতি ক্রমশ বেড়েই চলছে।আপনার কাছে ব্যাপারটা প্রচণ্ড উত্তেজনাকর যেমন মনে হচ্ছে,আবার ভয়ও পাচ্ছেন।না না আমি এর সাথে এই উপন্যাসটির সরাসরি তুলনা করছি না।কারন ঐ দুর্গম রাস্তায় উত্তেজনার চেয়ে বিপদের পরিমাণটাই বেশি।আর এই উপন্যাসটি পড়লে লাভ ছাড়া কোন ক্ষতি নেই।আমি মূলত তুলনা করছি এই দুটির মাঝের উত্তেজনাকর মুহূর্তগুলোর।তুলনা করছি দুটির ক্রমশ বেড়ে যাওয়া গতির।আর অজানা বাঁকের তো দুই ক্ষেত্রেই ছড়াছড়ি।আসলে উপন্যাসটির তুলনা হয়ত করা উচিত রোলার কোস্টার রাইডের সাথে।তবে হ্যা উপন্যাসটি পড়ার সময় একটা মানসিক অশান্তি আপনার সঙ্গী হবে।আপনার মনে হবে কখন এটা পড়া শেষ করবেন,কখন জানতে পারবেন সকল রহস্য এর সমাধান।এই উপন্যাসের যাত্রায় আপনি যখন যাত্রী হবেন,তখন আপনার মনে একটি প্রশ্নই থাকবে,এই যাত্রার শেষে কি আছে।

কাহিনী সংক্ষেপ-
সায়েম মোহাইমেন।সেই শৈশব থেকে তার স্বপ্ন একটি গাড়ি।তার বন্ধুদের মাঝে গাড়ি সম্পর্কে সে সবচেয়ে বেশি জানে।তাই তো তারা নিজেদের গাড়িও ছেড়ে দিত সায়েমের হাতে নির্দ্বিধায়।সেই সায়েমের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত এই ছিল!!তার নিজের কেনা প্রথম গাড়ি,সেই গাড়িতে প্রথম দিন।সে সময়ই সে ঘটিয়ে ফেলল দুর্ঘটনা,পৌঁছে গেল জেলে।
গোলাম মওলা ।বেচারা!টানা ১১ ঘণ্টা ভ্রমন করে ঢাকায় পৌঁছে কোথায় ঘুমাবে,তা না করে বেচারাকে রাতবেরাতে দৌড়াতে হল পুলিশস্টেশনে।হবে না কেন?সায়েম যে তারই বন্ধু,তাকে ছাড়াতে হবে না!কিন্তু সায়েম আর সে দুইজনেই জানেনা সামনে তাদের জন্য কত বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছে।কি ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে তারা।আপাতদৃষ্টিতে যেসব ব্যাপার সাধারন মনে হচ্ছিল তা ধারন করবে কি বিশাল ভয়াবহতা!

উপন্যাসটি পড়ার সময় প্রথমেই মাথায় রাখবেন হাতে সময় আছে তো?হাতে কোন কাজ রেখে পড়তে বসবেন না।কারন একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত আপনার আর উঠতে ইচ্ছে করবে না।একবার পড়া শুরু করলে এই উপন্যাসটি আপনাকে তার সাথে বেঁধে রাখবে।দেখা যাবে আপনি কখন যে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে পড়ে যাচ্ছেন তা নিজেও টের পাচ্ছেন না।

উপন্যাসটির গতিময়তার কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি।তবে এই গতি কিন্তু সবসময় একইরকম না।একেবারে শুরুর দিকে গতি খুবই সাধারন।হয়ত সামনের তুমুল গতির জন্য আস্তে আস্তে পাঠকদের তৈরি করছিল।কিন্তু কিছুদূর যাবার পর কাহিনী যে গতিতে চলতে শুরু করে তার তুলনা হতে পারে ব্রেক-ফেল করা কোন গাড়ি।আর সে গতি ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছিল,মনে হচ্ছিল যেন বুলেট ট্রেনকেও হার মানাবে।আর সাথে উপরি পাওনা হিসেবে রোমাঞ্চকর সব টুইস্ট তো আছেই।তবে এই অদ্ভুত গতিও একসময় কমতে শুরু করবে।তখন উপন্যাসের সে পর্যায়কে নিতান্ত সাধারন মনে হতে পারে।আসলে এর আগে যে গতিতে কাহিনী এগোচ্ছিল তাতে এটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক।অবশ্য এই সময়টা খুবই কম স্থায়ী।একটু পরই কাহিনী আগের গতি ফিরে পেতে শুরু করে।হয়ত আগের সেই ব্রেক-ফেল করা গতি সম্পূর্ণ পায় না,কিন্তু যা পায় তাও কম নয়।

এই উপন্যাসটির শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি প্রশ্ন করলে রহস্য,গতিময়তা,মারাত্মক সব টুইস্ট সহ নানা উত্তর দেওয়া যেতে পারে।কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলোর একটিও সঠিক উত্তর নয়।সঠিক উত্তর লেখকের লেখনী।দুর্দান্ত সাবলীল,প্রাঞ্জল ভাষায় কাহিনীর বর্ণনা করেছেন তিনি।তবে এ কারনে আমি একে সঠিক উত্তর বলছি না।আরও স্পষ্ট করে বললে এই উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ সম্পদ লেখকের লেখার দুর্ধর্ষ রসবোধ।যাকে বাংলায় বলে বাক্যবৈদগ্ধ,ইংরেজিতে “Wit”।আমি এর কোন উদাহরণ দিতে যাচ্ছি না,কারন পুরো উপন্যাসটিই বলতে গেলে এর উদাহরণ।

উপন্যাসটির এতসব ভালগুণ থাকলেও কিছু খামতিও আছে।অনেকে বলে উপন্যাসটির নারী চরিত্রের সাথে সম্পর্কিত ঘটনাগুলো বিরক্তিকর।আমার কাছে অবশ্য তা মনে হয়নি।এরকম গতির কাহিনীতে মাঝে মাঝে কিছুটা রিলাক্স হবারও দরকার আছে।তবে বিরক্তিকর যা লেগেছে উপন্যাসের তিন প্রধান পুরুষ চরিত্রেরই তাদের ভালভাসার নারীর প্রতি একই ধরনের আচরণ।এক্ষেত্রে মনে হয় তাদের যেন একই ছাঁচে গড়া হয়েছে!একটা-দুটো ঘটনার কারনে আমি এরকম বলছি না।পুরো উপন্যাসটিতেই আমার কথার প্রতফলন পাবেন।উপন্যাসটির আরেকটি খামতি কাকতালীয়টা।জীবনে কাক-তাল(!)জাতীয় ঘটনা ঘটবেই।আর এ ধরনের লেখায় একটু বেশিই ঘটবে এ তো জানা কথা।কিন্তু যখন রুডি চরিত্রের আগমন ঘটে,কিছু কিছু এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে যা ভেঙ্গে দিতে পারে কাকতালীয় ঘটনার সকল রেকর্ড।উপন্যাসটির আরেকটি জায়গা খামতির জায়গা এর ক্লাইমেক্স।একে অবশ্য খামতি পুরোপুরি বলা উচিত নয়।আসলে উপন্যাসটির ১২ আনা জায়গা যে গতিতে চলেছে,আর আপনার মনে যে প্রত্যাশা জাগিয়েছে তার কাছে একটু পানসে মনে হতে পারে ক্লাইমেক্সকে।

কাহিনীর শুরু আস্তে হলেও পরে যে বিশাল গতি পায় তা আগেই বলেছি।আসলে উপন্যাসটির ঐ অংশটি(মানে ১২ আনা অংশ!!) আন্তর্জাতিক মানের।ঐ অংশটি পাল্লা দিতে পারে বিশ্বের যে কোন থৃলারকে।মাথানষ্ট করা এই উত্তেজনাময় অংশ আপনাকে দিবে সর্বোচ্চ তৃপ্তি।লেখক কাহিনীর শেষে সব ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করেছেন,যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনাকে সন্তুষ্ট করবে।ক্লাইমেক্স পর্যন্ত রহস্য ধরে রাখতেও সক্ষম হয়েছেন তিনি।কিভাবে কি হয়েছে ধরতে না পারলেও সবকিছুর পিছনে কে আছে আমি অবশ্য আগেই টের পেয়েছিলাম।তবে তা লেখক প্রকাশ করার মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা আগে!!

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন এর সাথে আমার প্রথম পরিচয় তার করা অনুবাদের মাধ্যমে।তার করা বেশ কিছু অনুবাদ পড়ার পর জানতে পারি তার লেখা মৌলিক উপন্যাসগুলোর কথা।পড়ে ফেলি জেফরি-বাস্টার্ড সিরিজের প্রথম দুটি উপন্যাসও(বাকি দুটি এখনো পড়া হয়নি)।বেশ ভাল লেগেছিল পড়ে।ভাল লেগেছিল বাংলাদেশের কোন লেখক এধরনের লেখা লিখেছেন বলে।আমার এই ভাল লাগা এক লাফে কয়েক ধাপ উপরে উঠিয়ে নিয়েছে ১৯৫২।তিনি এই লেখাটি লিখেছেন সত্য এক ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে।তার ভাষায় ঘটনাটি ছিল পোয়েটিক জাস্টিসের চমৎকার উদাহরণ।আর সে উদাহরণ থেকে তিনি সৃষ্টি করছেন সার্থক থৃলার এর বাস্তব উদাহরণ।নাজিম ভাইয়ের এখন পর্যন্ত করা সেরা কাজ সম্ভবত এটাই।সামনে হয়ত তার কাছ থেকে আমরা এর চেয়েও ভাল লেখা উপহার পাব।সে উপহারের অপেক্ষায় রইলাম।

এক নজরে
বইয়ের নাম-১৯৫২-নিছক কোন সংখ্যা নয়…
লেখক-মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
প্রকাশক-বাতিঘর প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ-ফেব্রুয়ারি বইমেলা,২০১৪
প্রচ্ছদ-সিরাজুল ইসলাম নিউটন
গায়ের মূল্য-৩৪০ টাকা
আমার রেটিং-৪.৭৫/৫

দ্য এইট-ক্যাথারিন নেভিল

The-Eightমোঃ নাজিম উদ্দিন আমার প্রিয় লেখকদের একজন। মৌলিক এবং অনুবাদ দুটো জায়গাতেই সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত যতগুলো বই তিনি অনুবাদ করেছেন, মূল বইগুলো তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে সারা দুনিয়ায়। সেই বইগুলো অনুবাদ করে সেই পরিমান জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সত্যি কঠিন। এই কঠিন পরীক্ষায় নাজিম উদ্দিন খুব ভাল ভাবেই উৎরে গেছেন। ক্যাথারিন নেভিলের লেখা অত্যান্ত জনপ্রিয় উপন্যাস দ্য এইট। অনুবাদটি পড়ে আমার মনে হয়েছে নাজিম উদ্দিন আরেকবার নিজেকে পাঠকদের সামনে প্রমাণ করলেন। বইটিতে দুইটি সময়ের দুটি কাহিনী বলা হয়েছ। শেষের দিকে লেখক দুটিকেই একসাথে করেছেন। পৃথিবীর অনেক মহান ব্যাক্তিকে আমরা এই উপন্যাসে পাব রহস্য উন্মোচনের বিভিন্ন সময়। একটি দাবাবোর্ডের ক্ষমতা এত যা কিনা পাল্টে দিতে পারে দুনিয়ার প্রকৃতিক নিয়ম! দাবাবোর্ডটি গোপন রহস্য জানার জন্য হাজার হাজার মানুষ চেষ্টা করেছে ,শত শত বছর ধরে। তাদের মধ্যে আছে ভাল মানুষ এবং খারাপ মানুষের দল। কাদের জিত হবে এই খেলায়? সাদা নাকি কালো? ভাল নকি মন্দ? দ্য এইট ক্যাথারিন নেভিল অসাধারন একটি উপন্যাস। লেখক যেভাবে এক একটি রহস্যের সমাধান পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন তা এক কথায় অসাধারন।

দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড

The-Mysterious-Islandজুল ভার্নের যতগুলো বই আমি পড়েছি তারমধ্যে দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড বইটি আমার সব চাইতে প্রিয়। বইটি নিয়ে ছোটবেলার অনেক মজার স্মৃতি আছে আমার। আমার মনে হয় জুল ভার্ন তার পাঠকদের চমকে দিতে পছন্দ করতেন। পাতায় পাতায় চমক আছে বইটিতে। বই পড়তে যারা পছন্দ করেনা, তারা এই বইটি দিয়ে শুরু করতে পারেন। আমার বিশ্বাস অনেকের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস নিয়ে আসতে সাহায্য করবে বইটি। জুল ভার্নের এই বইটি পড়তে পেরে নিজেকে আমার ভাগ্যবান মনে হয়। একদল মানুষ বেলুন দুর্ঘটনায় নাম নাজানা একটি দ্বীপে এসে আশ্রয় নেয়। দ্বীপ থেকে কোন ভাবে উদ্ধার পাওয়ার উপায় তারা বের করতে পারে না। কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন তাদের আটকে রাখতে চায় দ্বীপটিতে। তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।। এরপর দ্বীপেই বসবাস করতে বাধ্য হয় তারা । কিন্তু  এক সময় তারা বুঝতে পারে দ্বীপে মানুষ বলতে শুধু তারাই না, আরও কেউ আছে, যে গোপনে তাদের উপর নজর রাখছে। এইভাবেই এগিয়ে যায় কাহিনী। কখনও বন্যপ্রাণীর আক্রমণ, কখনও বা পাশের দ্বীপের আদিবাসীদের – সবকিছুর মোকাবিলা করতে থাকে এই শহুরে মানুষের দলটি। । বেঁচে থাকার জন্য তাদের লড়াই করার লোমহর্ষক কাহিনী এই দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড।