ড্যানি নামের ছেলেটা এবং তার মজার বাবা

ড্যানি নামের ছেলেটা এবং তার মজার বাবাড্যানি নামের ছেলেটা এবং তার মজার বাবা রোয়াল ডালের এই বইটি পড়ে অসম্ভব আবেগ আপ্লুত হয়েছি। ছোটদেরকে নিয়ে যতগুলো উপন্যাস এখন পর্যন্ত লেখা হয়েছে তার মধ্যে এই বইটিকে প্রথম ধরা হয়। পৃথিবীতে কিছু সম্পর্কে বলা হয় স্বর্গিয় সম্পর্ক। যেমন মা-ছেলের সম্পর্ক, বাবা-মেয়ের সম্পর্ক ইত্যাদি। আমার মনে হয় বাবা আর ছেলের সম্পর্ক যদি বন্ধুর মত হয় তাহলে সেটার মত অসাধারন আর কিছু হতে পারে না। যে ছেলেগুলো একদম ছোট থাকতে মাকে হাড়ায় এবং বাবা যদি দ্বিতিয় বিয়ে না করে তাহলে সেই সব ছেলেগুলো হয় বাবার একদম কাছের মানুষ, বন্ধুর মত। বাবা আর ছেলের কাহিনী নিয়ে এত সুন্দর উপন্যাস আর পাওয়া যাবে না। ছোট্ট ড্যানির সব কিছু বাবাকে ঘিরে। বাবাই তার সব। মাকে হাড়িয়েছে বলতে গেলে জন্মের সময়ই। তাই বাবার সাথেই সব কিছু শেয়ার করে। ড্যানির কাছে মনে হয় তার বাবার মত জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান মানুষ আর নেই। ছোটবেলায় সব বাচ্চারা তাদের বাবাকে সুপারম্যান অথবা খুব বড় মেজিশিয়ান ভাবে। ড্যানির কাছে তার বাবাও সেরকমের একজন। সে থাকে বাবার সাথে পুরনো একটি ক্যারাভানে। নয় বছর বয়সে সে একটি সত্য জেনে যায় তার বাবা সম্পর্কে। তার পরের কাহিনী হলো বাবা আর ছেলের এ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী। এক দুষ্ট জমিদারকে জব্দ করার ভয়ানক ফন্দি।

চাসিং টুমোরো

Chasing Tomorrowসিডনি শেলডনের চাসিং টুমোরো  বইটি পড়ে আমি নতুন করে আবার প্রেমে পরেছিলাম, গল্পটির চিরত্রগুলোর। বেশ কিছু বছর ধরে  ট্রেসী হুইটনি এবং জেফ স্টিভেনস ধরা ছোয়া যায় না এমন একটি দল চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। একসাথে তারা দুজনে ধনী , লোভী ও দূর্নীতিবান লোকেদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর ভয়ংকর চ্যালেন্জ মোকাবেলা করে। এক সময় নিজেদের জীবন যাপনের জন্য যথেষ্ঠ টাকা রোজগর করে ফেলে তারা। একদিন তারা তাদের এই অতি উ্তেজনামূলক জীবন ধারা বদলে ফেলে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের পরের সময়টি ছিল অসম্ভব সুন্দর। তাদের জীবন দারুন থেকে দারুনতর হয়ে যাচ্ছিল। ব্রিটিশ মিউজজিয়ামে জেফ একটি কাজ পায়। কাজটি জেফের মনের মতো ছিল। কেননা সে সব সময়ই পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক জিনিস পত্র পছন্দ করত। এই সময়টাতে ট্রেসী  মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জেফ মন দেয় ক্যারিয়ারের দিকে। কিন্তু গর্ভধারণকালে ট্রসির কছু সমস্যা দেখা দেয় । সেে সন্তান  জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়। এভাবেই এক সময় তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। দশ বছর পর দেখা যায় তারা আলাদা  আলাদা ভাবে বাস করছে। জেফ আবারো ফিরে যায় আগের পেশায় আর ট্রেসী কোলারডোতে নতুন ভাবে শুরু করে নিজের জীবন। অনেক দিন পরে ট্রেসী ফ্রেন্চ ইন্টারপোল অফিসারের কাছ থেকে একটি ফোন পায়। তাকে কিছু দূর্ধর্ষ খুনের ঘটনার কথা বলা হয়। কেন ইন্তটারপোল অফিসার ফোন দেয় তাকে ? তবে কি  ট্রেসীকে ফিরে যেতে হবে আবার আগের পেশায় ? আবারো কি জেফের মুখোমুখি হবে সে ? জানতে হলে পড়তে হবে সিডনি শেলডনের চ্যাসিং টুমোরো !!!! চমৎকার একটি উপন্যাস।

নাথিং লাস্টস ফরেভার

Nothing Lasts Foreverনাথিং লাস্টস ফরেভার বইটিি সিডনী শেলডনের আর একটি অনবদ্য সৃষ্টি। ভালোবাসা,আবেগ,ঘৃণা,সমাজ,খুুন,পেশা,এ্যাম্বিশন সব কিছুর এক দারুণ সংমিশ্রণ এই বইটি। আমার মতে নাথিং লাসটস ফরেভার একটি অতি চমৎকার বই। তিন  জন নারী ডাক্তারের প্রতিদিনের জীবন, তাদের অতীত, তাদের বর্তমানই এই গল্পের মূল প্লট। তিন জন নারী ডাক্তার যাদের ব্যাকগ্রউন্ড ভিন্ন, যাদের চিন্তা ধারায় হাজার মাইল তফাৎ …কিন্তু জীবনের কোন একটি জায়গায় তারা তিনজনই অভিন্ন। এটিই এই গল্পের থিম। তাদের জীবন সম্পুর্ণ বদলেে যায় যখন তারা সান ফ্রান্সিসকৈো শহরের একটি খ্যাতনামা হাসপাতালে ইণ্টর্ণশীপ পরবর্তী ট্রেনিং এ যোগ দেয়। এখানে এসেই তাদের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তাদের একজনের কারণে যখন পুরো হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাাওয়ার উপক্রম হয় তখন  আরেকজন খুন করে বসে এক রোগীকে। অপরদিকে আর একজন নিজেই খুন হয়ে যায় । এসবের মাঝেই লেখক গভীর ভাবে তুলে ধরেছেন কিভাবে নারী ডাক্তাররা অবহেলিত হয়। নারীরা এখনো কিভাবে কেবল শয্যা সঙ্গী হিসেবেই বিবেচিত হয়। আমার কাছে বইটিকে সিডনী শেলডনের লিখা এ যাবৎ কালের সেরা বই মনে হয়েছে। মাত্র তিন ঘণ্টায় আমি পুরো গল্পটি শেষ করেছি । আসলে ছেড়ে উঠবার মত বই এটি নয়। আমার দৃড় বিশ্বাস এই বইটি পড়ার পরে অবশ্যই সিডনী শেলডন আপনার প্রিয় লেখকদের তালিকায় উপরের দিকেে স্থানন করে নিবেন। ঠিক যেমনটি হয়েছে আমার ক্ষেত্রে।

দ্য এইট

The-Eightবইটির ব্যাককভারে লেখা আছে,“দ্য দা ভিঞ্চি কোড পড়ে যেসব পাঠক রোমাঞ্চিত হয়েছেন বহুস্তরবিশিষ্ট সিক্রেটের দ্য এইট পড়ে আরেকবার মুগ্ধ হবেন তারা”।বইটি পড়তে পড়তে বারবার আমি এই কথাটার সার্থকতা উপলব্ধি করেছি।সত্যিই আমি মুগ্ধ হয়েছি।কাহিনী যত এগিয়েছে এই মুগ্ধতা বেড়েছে,বিন্দুমাত্র কমেনি।

বাস্তবিকই বহুস্তরবিশিষ্ট কাহিনী বলতে যা বোঝায় দ্য এইট তাই।বইটিতে মূলত বর্ণিত হয়েছে দুই সময়ের দুটি কাহিনী যা বইয়ের শেষে এসে মিলিত হয়েছে এক বিন্দুতে।দুটো কাহিনীই সমান্তরালভাবে চলেছে।একটি কাহিনীর শুরু ১৭৯০ সালে,অন্যটির ১৯৭২ সালে।এই দুই সময়ের দুই কাহিনীর কেন্দ্রে রয়েছে দুই নারী।১৭৯০ সালে শুরু হওয়া কাহিনীতে মিরিয়ে,আর ১৯৭২ সালের কাহিনীতে ক্যাথারিন।মূলত তাদের ঘিরেই কাহিনী আবর্তিত হয়েছে।আর এই ভিন্ন সময়ের ভিন্ন চরিত্রের দুই নারীকে সংযুক্ত করেছে একটি অভিন্ন জিনিস,একটি দাবাবোর্ড।শার্লেমেইনের কিংবদন্তীতুল্য দাবাবোর্ড যার মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছর আগের এক শক্তিশালী এবং বিপদজনক সিক্রেট ফর্মুলা।

এই সিক্রেট ফর্মুলা জানার জন্য হাজার হাজার বছরে চেষ্টা করেছে হাজার হাজার মানুষ।যাদের মধ্যে রয়েছে নেপোলিয়ন,নিউটন,পিথাগোরাস,ক্যাথারিন দি গ্রেট,রিশেলু,রুশো,ভলতিয়ার সহ আরও অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তি।এই ফর্মুলা জানতে হলে পেতে হবে সেই দাবাবোর্ড আর তার ঘুঁটি।

১৭৯০ সাল—
এই কাহিনী শুরু হয় মন্তগ্লেইন অ্যাবি থেকে যেখানে নান হবার অপেক্ষায় আছে দুই এতিম খালাত বোন ভ্যালেণ্টাইন এবং মিরিয়ে।সেসময় বসন্তকাল চলছে।হঠাৎ অ্যাবিস অ্যাবির সব নানকে ডেকে পাঠায়।তাদের তিনি জানান তাদের এখানে মাটির নিচে আছে শার্লেমেইনের কিংবদন্তীতুল্য দাবাবোর্ড।এই দাবাবোর্ডের গোপনীয়তা তখন হুমকির মুখে।তিনি তাই সিদ্ধান্ত নিলেন দাবাবোর্ডটি মাটি থেকে তুলবেন।তারপর তার সব ঘুঁটি ছড়িয়ে দিবেন বিভিন্ন জায়গায়।নানদের উপর দায়িত্ব পড়ে কাজটি করার।তাদের জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করতে হবে এগুলোকে।

১৯৭২ সাল—
২৩ বছর বয়সী ক্যাথারিন ভেলিস।সে কম্পিউটার,গণিত ও সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ।সে না চাইলেও জড়িয়ে পড়ে এই দাবাবোর্ড আর তার রহস্যের সাথে।সে কাজ করে একটি সিপিএ ফার্মে,যেখানে সে প্রথম নারী হিসেবে নিযুক্ত হবার সম্মানে সম্মানিত।কাজের সুত্রে তাকে যেতে হয় আলজেরিয়ায় যেখানে রয়েছে রহস্যের চাবিকাঠি।

দ্য এইট এর লেখিকা ক্যাথারিন নেভিল।ভাবতে অবাক লাগে তিনি কিভাবে এত জটিল একটা প্লটের বই লিখলেন।উভয় কাহিনীতেই রয়েছে অসংখ্য চরিত্র যেখানে একই সাথে ঘটে চলেছে অসংখ্য ঘটনা।সেসব ঘটনা আর চরিত্রের হিসেব রাখতে আমিই পড়তে গিয়ে হিমশিম খেয়েছি।তিনি সেখানে কিভাবে সব হিসেব রেখে লিখলেন!উভয় কাহিনীতে দেখা যায় দুটি দল খেলছে যেখানে একদল ভাল,একদল খারাপ।আর দুটি দলের মানুষ সেখানে ঘুঁটি।হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে এই খেলা,যে খেলা ঘিরে রচিত হয়েছে অজস্র ষড়যন্ত্র।মিরিয়ে আর ক্যাথারিন উভয়ই প্রথমে মনে করে তারা এই খেলায় সামান্য সৈনিক।পরবর্তীতে তারা আবিস্কার করে তারা মোটেও সাধারণ নয়,বরং তারাই এই খেলার মূল খেলোয়াড়।

প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি থৃলার।কিন্তু পড়ার সময় বিন্দুমাত্র বিরক্তিকর কিছু পাইনি।প্রতিটি পৃষ্ঠা আগ্রহের সাথে উল্টাতে বাধ্য হয়েছি।লেখিকা পুরোটা সময় আমার আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছেন।আর বইটির শেষ অংশতো সবচেয়ে উপভোগ্য।বইটির শেষে তিনি যে টুইস্টটি এনেছেন তা এক কথায় অনবদ্য।এই টুইস্টটিই দুই সময়ের দুই কাহিনীর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।বইটির একেবারে শেষে না আসা পর্যন্ত আমি ব্যাপারটা ধারনা করতে পারিনি,যদিও ব্যাপারটির একটি ক্লু অনেক আগেই ছিল।

বইটি আমার কাছে যে এত উপভোগ্য হয়েছে তার কৃতিত্ব একা লেখিকার নয়।এই কৃতিত্বের সমান ভাগীদার অনুবাদকও।আর বইটির অনুবাদক আমাদের সবার প্রিয় মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন।তিনি বইটিতে অসাধারণ কাজ করেছেন।এত বিশাল ক্যানভাসের একটি জটিল লেখাকে তিনি যেভাবে সাবলীল ভাষায় অনুবাদ করেছেন তা প্রশংসার দাবিদার।যদিও কিছু নগণ্য জায়গায় অনুবাদ চোখে লেগেছে।যেমন তিনি কেমনে না লিখে কিভাবে,চলেন না লিখে চলুন লিখতে পারতেন।এটি অবশ্য একান্তই আমার ব্যাক্তিগত মতামত আর তেমন কোন ভুলও নয়।আর তিনি যে সুবিশাল কাজ করেছেন,এসব উপেক্ষা করা যায়।কিন্তু বইটির বিভিন্ন অংশে যে অজস্র বানান ভুল রয়েছে তা উপেক্ষা করা যায় না।

বইটির নাকি ফায়ার নামক একটি সিকুয়েল আছে।যদিও সেটি প্রথমটার মত এত বিখ্যাত নয়।তারপরেও আমার ফায়ার পড়ার অত্যন্ত আগ্রহ রয়েছে।আশা করি ভবিষ্যতে বাতিঘর আর মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন মিলে আমাদের দ্য এইট এর মতই ফায়ার এর একটি মানসম্পন্ন অনুবাদ উপহার দিবেন।সেই দিনটির অপেক্ষায় থাকব।

এক নজরে
বইয়ের নাম-দ্য এইট
লেখিকা-ক্যাথারিন নেভিল
অনুবাদক-মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
অনুবাদ প্রকাশক-বাতিঘর প্রকাশনী
অনুবাদ প্রকাশকাল-সেপ্টেম্বর,২০১১
প্রচ্ছদ-দিলান
গায়ের মূল্য-৪৫০ টাকা
আমার রেটিং-৪.৫/৫

পরিশেষে বলতে পারি যারা এখনো বইটি পড়েননি পড়ে ফেলুন,বিন্দুমাত্র হতাশ হবেন না।

রেভুলেশন ২০২০

রেভুলেশন ২০২০২০১১ সালে চেতন ভগতের ভিন্নধর্মী উপন্যাস রেভুলেশন ২০২০ প্রকাশিত হয় । তুমুল সাড়া জাগানো এই উপন্যাসে দেখানো হয় ভারতের বারানাসি শহরে বসবাসরত তিনজন ছেলে মেয়ের একসাথে বেড়ে ওঠা , তাদের শিক্ষা , ভালোবাসা এবং শেষ পরিণতি । গোপাল এবং রাঘব একই বিদ্যালয়ে পড়া দুই বন্ধু যাদের বন্ধুত্বের গভীরতা সমান কিন্তু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে রাঘব যেখানে আকাশ গোপাল সেখানে মটিও নয় বরং তারও নিচের ভূখন্ড । সময়ের সাথে সাথে বয়স বেড়ে টগবগে তরুণে পরিণত হওয়া দুজনই ইন্জীনিয়ারিং কলেজে ভর্তির জন্যে উঠে পড়ে লাগে ।  রাঘব টিকে যায় প্রথমবারেই আর গোপাল দুই দুইবার চেষ্টার পরেও পারে না । জীবনের চরম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে গোপাল সিদ্ধান্ত নেয় সে তার সকল মেধা এবং শ্রম দিয়ে টাকা উপার্জন করবে । তা সে যেভাবেই হোকনা কেন ! অপরদিকে রাঘব চায় সমাজকে পরিবর্তন করতে । সে চায় এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে যেখানে থাকবেনা দূর্নীতি বা অনৈতিক কোনকিছু । এই গল্পের সবচেয়ে চান্চল্যকর ব্যাপার হল এই যে তারা দুজন ই ভালোবাসে আর্তীকে যে কিনা তাদরই এক সময়কার সহপাঠী ও বনধু । পুরো গল্পের নায়ক গোপাল হলও শেষ পর্যন্ত সব দিক থেকে জয় রাঘবেরই হয় । সে বিপ্লব ঘটানোর মধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করে নিজের স্বপ্ন পুরণে সক্ষম হয়  এবং আর্তীর ভালোবাসাও সে অধিকার করে নেয় । এভাবেই পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়মে সত্য আর নিষ্ঠার জয় হয় । এই গল্পে  চেতন ভগত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রাত্যহিক কিছু ঘটনা বা ব্যাপারকে অত্যন্ত বাস্তবতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন যার কারণেে এই বইটি দখল করে নিয়েছে সকল বই পড়ুয়ার বুক শেলফ ।

দ্য আয়রন হীল

The Iron Heelজ্যাক লন্ডন ছিলেন বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকাতে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রথিভাবান লেখক-সাহিত্যিকদের একজন। তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশ ছোয়া। তার লেখা এই উপন্যাসটি পড়ে অনুপ্রানিত হয়েছে বিশ্বের অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তি। রাশিয়ান বিপ্লবী লিও ট্রটস্কিএবং নোবেল পাওয়া ফরাসী ঔপন্যাসিক আনাতোলে ফ্রাসের মত ব্যাক্তিগন দ্য আয়রন হীল উপন্যাসটি পড়ে রায় দিয়েছেন এই বইটি একটি শিল্পকর্ম। যা যুগ যুগ ধরে গন মানুষের পক্ষে কথা বলবে। শত বছর আগে বইটি প্রকাশ হওয়ার আগে লন্ডন বইটি নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন “এটা আমার জন্য কোন বন্ধু নিয়ে আসবে না”। সত্যি তাই হয়েছিল। তখনকার আমেরিকান সরকার বইটিকে বাজেয়াপ্ত করেনি কিন্তু এমন ব্যবস্থা করেছিল যাতে বইটি বেশি জনপ্রিয়তা না পায়। তাই হয়তো তার এই বইটি দ্য কল অফ দ্য ওয়াল্ড এবং হোয়াইট ফ্যাং– এর মত জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি। দ্য আয়রন হীল জনপ্রিয়তা পায় তার মৃত্যুর পরে। লন্ডন দ্য আয়রন হীল উপন্যাসে বর্ননা দিয়েছে কিভাবে শাসকগোষ্ঠী জনগনকে শোসিত করে এবং ঠকায়। প্রথমেই তারা বাক স্বাধীনতা এবং সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতাকে অবৈধ করে দেয়, সংবাদ এবং তথ্যের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। সমাজতন্ত্রের আদর্শে দীক্ষিত বিপ্লবী আর্নেস্ট এভারহার্ড এর সংগ্রামী জীবনের অনেক কথা আছে বইটিতে। সবসময় শ্রমিকরা বঞ্চিত হয় তাদের নেয্য অধিকার থেকে। নেয্য অধিকারের জন‍্য নিম্নশ্রেণীর মানুষকে যে কতটা মূল‍্য দিতে করতে হয় তা এই বই না পড়লে সাধারন মানুষ বুঝতে পারবে না কখনো।

 

 

 

ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট

Crime and Punishmentফিওদোর দস্তয়েভ্স্কির বই যখনিই পড়েছি তখন আমি নিজেই অনুভব করেছি আমার চিন্তা ভাবনাগুলো আর আগের মত থাকছে না। যে কোন বিষয় আমাকে আরো গভির ভাবে ভাবাতে সাহায্য করছে ফিওদোর দস্তয়েভ্স্কির লেখাগুলো। তার লেখা বই বেশি পড়ার সুযোগ নেই। তারপরও যে দুই-চারটি পড়েছি সেগুলো মানুষের জীবন দর্শনকে নতুন করে উপলব্ধি করাতে তারিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। যুবক বয়সে রাশিয়ার নিম্নবিত্ত ও গরিবদের দুরবস্থা দেখে ফিওডর গভীর বেদনা অনুভব করতেন। সোশালিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পরে তাকে সাইবেরিয়াতে নির্বাস জীবন কাটাতে হয়। বয়স কম বলে  অসাধারণ এই লেখক-ঔপন্যাসিক মৃত্যুদন্ডের হাত থেকে বেচে যান। ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট বইটিকে বিশ্বের সেরা ১০টি বইয়ের একটি বলা হয়। কি আছে বইটিতে ? বইটি আসলে মানুষের আত্মশুদ্ধির বড় একটি উদাহরন। উপন‍্যাসের মূল চরিত্রে আছে রাসকলনিকভ নামের একজন যুবক এবং একজন  পতিতা নারী, যার নাম সোনিয়া। মানুষের আত্মাকে শুদ্ধ বা পরিষ্কার করার জন্য প্রেম-ভালবাসার উপরে আর কিছু নেই। স্বর্গিয় এই মানব গুন দিয়ে চাইলেই পৃথিবীতে অনেকভাল ভাল কাজ করা যায়। তার প্রমান পৃথিবীতে ভুরি ভুরি আছে।সমাজ বিপ্লবের আগে রাশিয়ার অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল, গরিবরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভাল ভাবে বেচে থাকার জন্য রাসকলনিকভ অনেক চেষ্টা করে কিন্তু তা সম্ভব হয় না। তাই সে এক পয়সাওয়ালা বৃদ্ধাকে খুন করে তার সবকাছু নিয়ে আত্মগোপন করে। আত্মগোপন থাকার সময় রাসকলনিকভকের পরিচয় হয় সোনিয়া নামের একজন পতিতার সাথে। একসময় দেখা যায় দুজন দুজনকে ভালবেসে ফেলে। সোনিয়ার প্রেম রাসকলনিকভকের মধ্যে থেকে ভাল মানুষটিকে বের করে আনে। সে আত্মসমর্পণ করে এবং বিচারে নির্বাসিত হয় সাইবেরিয়ায়। শুরু হয় দুজন মানুষের অপেক্ষার পালা। নির্বাসিত জীবন শেষে মুক্ত রাসকলনিকভ বেরিয়ে আসবে শুদ্ধ মানুষ হয়ে। তারই অপেক্ষায় থাকে সোনিয়া।

টেম্পল

Templeম্যাথিউ রীলির লেখা কোন বই আগে পড়িনি।  অষ্ট্রেলিয়ান এই লেখকের বইটি হাতে নিয়ে তাই একটু দন্দে ছিলাম। অনুবাদকের নামটির সাথেও আমার পরিচয় নেই। যাই হোক শেষ পর্যন্ত কিনেই ফেললাম। অনেক দিন বইটি না-পড়া অবস্থায় পরে ছিল বাসায়। কেন জানি বইটি পড়ার কোন আগ্রহ পাচ্ছিলাম না। এক বন্ধের দিন কোন কাজ না থাকায় পড়তে শুরু করলাম বইটি। তারপর পাতার পর পাতা পড়ে গেলাম নিজের অজান্তে। বইটি শুধু  অ্যাকশন না, অ্যাকশনের বিরাট একটি প্যাকেট। ম্যাথিউ রীলির প্রথম বইটি পড়ে আমি তার ফ্যান হয়ে গেলাম। যে পাঠকগন অ্যাকশন টাইপ বই পছন্দ করে তাদেরকে আমি বইটি পড়ার জন্য বলবো। চমৎকার গতিময় একটি কাহিনী। দুটি সমান্তরাল কাহিনীর অপূর্ব বর্ননা দিয়েছেন লেখক। বইটিকে আমার মনে হয়েছে খুব সহজ ভাষায় লেখা অসাধারন একটি উপন্যাস। পেরু’র প্রাচীন ইনকাদের একটি পবিত্র ধর্মিয় মূর্তি ছিল। মূর্তিটিকে তারা আইডল নামে ডাকতো। ধারনা করা হয় এই মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছে পৃথিবীতে ছিটকে আসা কোন উল্কাপিন্ডের খন্ড থেকে। উল্কাপিন্ডটি ছিল আগা-গোড়া থাইরিয়াম নামক এক প্রকার দূর্লভ ধাতু দিয়ে তৈরি। যা কখনও পৃথিবীতে পাওয়া যায় না। আলবার্তো লুইস নামের এক ধর্মপ্রচারকের  লেখা ম্যানাস্ক্রিপ্ট থেকে জানা যায় আইডলটার কাহিনী এবং কোথায় সেটা লুকানো আছে। আইডলটার দখল নেওয়ার জন্য অনেকগুলো দল মাঠে নামে। জার্মান নাজীরাও আছে সেই দলে। শুরু হয় ভয়ন্কর এবং শ্বাসরুদ্ধ এক কাহিনী। হাসান খুরশীদ রুমীকে অনেক অনেক ধন্যবাদ বইটি এত সুন্দর অনুবাদের জন্য।

দ্য গডস দেমসেলভস

The Gods Themselvesআইজাক আসিমভ আমার অসম্ভব প্রিয় একজন লেখক। কারন হলো তার লেখার বিষয়-বস্তুগুলো সম্পূর্ন অন্য রকম। আসিমভ যে বিষয়গুলো নিয়ে লিখেন তা অন্য কোন লেখক ভাবতেও পারে না। ভবিষ্যাৎতে আমাদের এই পৃথিবীটা কেমন হবে, তারই একটি কল্প-কাহিনী এই উপন্যাসটি। আইজাক আসিমভকে কেন অসাধারন প্রতিভার একজন বৈজ্ঞানিক কল্প-কাহিনী লেখক বলা হয়, তা পাঠকরা সহজেই বুঝতে পারবে এই বইটি পড়লে। দ্য গডস দেমসেলভস উপন্যাসটি তিনটি  ভাগে ভাগ করেছেন লেখক। প্রথম পর্বটি খুবই ইন্টারেষ্টিং। রহস্য এবং দ্বন্দ্বে ভরা সবগুলো চরিত্র, যা পাঠকদের অবশ্যই আকর্ষীত করবে। কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসের সব ধরনের উপকরন আছে বইটিতে। আসিমভকে এজন্যই এত ভাল লাগে আমার। আগামী ১০০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর মানুষ যে সংকটটিতে সবচেয়ে বেশি ভুগবে তা হল এনা‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌র্জি মানে তেল, গ্যাস ইত্যাদি এ জাতিয় জিনিসের। ঘটনাক্রমে মানুষ প্রচুর এনা‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌র্জি উৎপন্ন করে এমন একটি উপাদান পায় এলিয়ানদের সাথে কিছু ধাতুর বিনিময়ের মাধ্যমে। তরতর করে উন্নতি করতে থাকে পৃথিবীর মানুষ। কিন্তু এর যে একটি খারাপ দিকও আছে সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতে রাজি না। প্রচুর এনা‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌র্জি উৎপাদনে সক্ষম    রেডিওএকটিভ পদা‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌র্থটি মুহুর্তে পৃথিবীকে পরিনত করতে পারে আগুনের পিন্ডতে।যুগ যুগ ধরে পৃথিবীকে এমন বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে কিছু ভাল মানুষ। আর এই সব মানুষরা সব সময় পৃথিবীর মঙ্গল চায়। শুরু হয় পৃথিবীকে বাচানোর আর একটি আশ্চর্য ও উত্তজনাপূর্ন কাহিনী। অপুর অনুবাদ নিয়ে বিতর্ক হওয়ার কোন কারনই নেই।

রুশ গল্প সংকলন

Russ Golpo Shonkolonরুশ সাহিত্য যারা পড়তে পছন্দ করে তাদের জন্য এই বইটি ব্যক্তিগত কালেকশনে রাখার মত একিট বই। একসাথে এতগুলো ভাল গল্প একসাথে সহজে পাওয়া যায় না। গল্পগুলোর অনুবাদও খুব ভাল হয়েছে। যে সাতটি গল্প এই বইটিতে আছে সবগুলোই অসাধারন। কারন রুশ সাহিত্যের সবগুলো গল্প থেকে বাছাই করে এই সংকলনটি প্রকাশ করা হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো বইটির আকার আর একটু বাড়িয়ে আরো কিছু গল্প এড করা গেলে আরো ভাল হতো। অন্তত ১০ টি করা যেতো। আলেকজান্দার পুশকিন, নিকোলাই গোগল, ইভান তুরগেনেভ, লেভ তলস্তয়, মিখাইল সালতি কভশ্চেদ্রিন , আন্তন চেখভ, ভ্লাদিমির ক্রলেঙ্কো মত পৃথিবী বিখ্যাত রুশ লেখকদের লেখা একসাথে পড়ার মজাই আলাদা। গল্পগুলোর লেখক ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারনে বইটি পড়ার সময় পাঠক গল্পগুলো আলাদা আলাদা সাধ সহজেই ধরতে পারবে। যেমন নিকোলাই গোগলের লেখাটি পড়ে পাঠক সাধ পাবে হাস্যরসের, আর লেভ তলস্তয় সব সময় যেমন লিখেন মানে সাধারন মানুষের ছোট ছোট সুখ দুঃখের সুন্দর কাহিনী। মিখাইল সালতির দুই হুজুর ও চাষার কাহিনী গল্পটি কম বেশি সব পাঠকেরই জানা। এই গল্পটিই আমার সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে। শওকত হোসেনকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয় এমন একটি সংকলনের জন্য।