অর্ধেক জীবন

অর্ধেক জীবনসুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পাঠকদের জন্য অসাধারন সব বই লিখে গেছেন। অর্ধেক জীবন উপন্যাসটিও অসাধারন একটি কাহিনী। বইটিতে অনেক সত্য ঘটনা এবং লেখকের ছোট থেকে বেড়ে উঠার কথা আছে। আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহতার কথা এবং ভারতবর্সকে কাটাকুটির ইতিহাস। বইটিকে আমার উপন্যাসের চেয়ে লেখকের স্মৃতি-কথা বলে বেশি মনে হয়েছে। আরো মনে হয়েছে অর্ধেক জীবন বইটিকে শুধু উপন্যাস হিসাবে দেখলে হবে না কারন বইটি একটি প্রজন্মের ইতিহাস বহন করছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়র ছোটবেলা থেকে ষাটের দশকের সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা এবং তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে এই বইয়ে। সুনীল চমৎকার ভাবে গুছিয়ে বলেছেন তার শৈশব, কৈশোর এবং যুবক বয়সে নানা কথা। পাশপাশি এসেছে  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা, ৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, দেশবিভাগের পরের নানা সমস্যা। বর্ননা করেছেন তেতাল্লিশের দূর্ভীক্ষের অভিজ্ঞতা। দেখেছেন অনাহারে মৃত্যুর মিশিল। তার লেখা শব্দগুলোর শক্তি এত বেশি যে, ৪৬ সালের ভয়াবহ হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার নিশৃংসতা পাঠকদের সামনে বাস্তব চিত্রের মত দেখা দিবে। অতন্ত্য মর্মস্পর্শী বর্ণণা যা পাঠকদেরকে অবশ্যই ভাবাবে। দেশ ভাগের পরের কাহিনী পড়ে আমি অবক হয়েছি। ইংরেজদের একটি মাত্র কলমের খোছা কেমন করে বদলে দিয়েছে গোটা ভারতবর্সকে। যে দেশ আমার ছিল, যে মাটি আমার ছিল হঠাৎ করেই তা কেড়ে নেয়ার ইতিহাস এই বইটি। কিশোর বয়সে এঘটনাগুলো লেখকের মনে প্রচন্ড ভাবে দাগ কেটেছে। সে সময় গান্ধি, নেহেরু কিংবা জিন্নার চেয়ে অনেক বেশি জন সমর্থন নেতাজী সুভাষচন্দ্রে উপর ছিল তা আমি জেনেছি এই বইটি পড়ে। ইতিহাসের প্রতি যাদের আগ্রহ আছে তারা এই বইটি পড়ে দেখতে পারেন।

যুবক যুবতীরা

যুবক যুবতীরা-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়এই উপন্যাসটি আসলে আমাদের গল্প, আমাদের চারপাশের গল্প, যৌবনের গল্প। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যৌবনে নিজে যা দেখেছেন সেই কথাগুলো পাঠকদের গল্বপের ছলে বলেছেন এই উপন্যাসে। কাছের বন্ধু হয়েও মানুষ একজনের চেয়ে আরেক জন সম্পূর্ন আলাদা। চিন্তা-চেতনায়, অচার-ব্যবহারে সব দিক দিয়ে একেক জন একেক রকম। এই চরিত্রগুলোর কথাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তুলে ধরেছেন এই  উপন্যাসটিতে। উপন্যাসটি যখন তিনি লিখেছিলেন তখনও তিনি আজকের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হয়ে উঠেননি। এটা তার প্রথম দিকের লিখা। প্রথম দিকের লিখা হলেও বইটি পাঠকদের ভাল লাগবে। কারন পাঠকদের মনে হবে উপন্যাসটির চরিত্রগুলো তাদেরই পরিচিত মানুষ। কয়েকজন বন্ধুর গল্প নিয়ে এই উপন্যাসের কাহিনী। তাদের একান্ত নিজস্ব ভাবনা, তাদের ভালবাসা প্রকাশের ভাব, তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পাঠকদের খুব ভাল করে বুঝাতে পেরেছেন। একসাথে থেকেও সবাই আলাদা। একজনের দৃষ্টিভঙ্গি অন্য জনের সাথে মিলে না। থাকে অনেক মতের পার্থক্য। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ে লেখার কারনে প্রতিটি চরিত্রই আলাদা, আলাদা প্রান পেয়েছে। এই উপন্যাসটি যখন তিনি লিখছেন, তখন তার উপন্যাস লিখার তেমন একটা অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি ছিলেন উঠতি একজন কবি। তারপরেও বইটি আমার বেশ ভাল লেগেছে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ঃ কাকাবাবু সমগ্র

কাকা সমগ্রসন্ত আর কাকাবাবুর অভিযানের কাহিনী নিয়েই দু- মলাটের মধ্যে এবার খন্ডে খন্ডে ‘কাকাবাবু সমগ্র’। এই প্রথম খন্ডে ছ- ছটি উপন্যাস। ভয়ঙ্কর সুন্দর, সবুজ দ্বীপের রাজা, পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক , খালি জাহাজের রহস্য , মিশর রহস্য ও কলকাতার জঙ্গলে।

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : প্রথম আলো

প্রথম আলো book by sunilতীর সামনে ছুটে যাওয়ার আগে কিছুটা পিছিয়ে যায়,  ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে যে- কোনও সমাজের মাঝে মাঝে ঐতিহ্য ও ইতিহাসের দিকে পিছু ফিরে দেখা দরকার। আমাদের দেশের অনতি- অতীতের পুনর্দর্শন ও পুনর্বিচার নিয়েই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বর্ণাঢ্য, বেগবান উপন্যাস ‘প্রথম আলো’ ।

ছবির দেশে,কবিতার দেশে

Chobir-Deshe-KobitarDesheসনুীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার অসম্ভব প্রিয় লেখকদের একজন।তাঁর চলে যাওয়াটা অনেকের মত আমিও মেনে নিতে পারি না।একবার চিন্তা করুন তো সনুীলের লেখা ছাড়া বাংলা সাহিত্য।আমার মনে হয় এটা চিন্তা করাও দোষের।সনুীলের হাত ধরে বাংলা সাহিত্য পাড়ি দিয়েছে অনেক পথ।বাংলা সাহিত্য সনুীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে গেছে খ্যাতির চুড়ায়।বিনিময়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন অফুড়ন্ত কবিতা,গল্প-উপন্যাস আর অসামান্য কিছু প্রবন্ধ।ছবির দেশে,কবিতার দেশে সেরকমই একটি বই বা খন্ড একটি আত্মজীবনীও বলা যায়।কোন বইয়ে বর্ননা বেশী থাকলে আমার ভাল লাগে না।কিন্তুু এই বইটি পড়ে মনে হয়েছে বর্ননা না থকলে কোন ভাবে বইটি পাঠকদের বোঝানো যেতো না।বর্ননাও যে এত নিখুঁদ এবং সুন্দর ভাবে দেওয়া যায় ছবির দেশে,কবিতার দেশে বইটি পড়লে বুঝা যায়।আমার মতে প্যারিস না দেখলেও চলবে কিন্তু এই বই না পড়লে জীবন বৃথা।অসাধারণ একটা বই প্যারিস নিয়ে।সুনীল এর ভ্রমন কাহিনী গুলো এক নিঃশ্বাসে পরার মত।প্যারিসের শহরের বিবরন পড়ে শহরটি চোখের সামনে দেখছিলাম পড়ার সময়।সনুীলে বর্ননাতে শুধু জায়গার বিবরণী থাকে না, থাকে ইতিহাস,মতবাদ, গল্প-মিথ সবকিছু।ফ্রান্সকে বলা হয় চিত্রকলার ভূ-স্বর্গ,প্যারিস হলে তো কথাই নেই।বইটি পড়লে পৃথিবী বিখ্যাত কাছু আর্ট সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাবে।আছে আসাধারন কিছু কবিতার লাইন।মার্গারিট নামের মেয়েটিকে সনুীল ভালবেসে ছিলেন কিনা জানিনা।তবে মার্গারিট নামের ফরাসি মেয়েটি তার জীবনের অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল।মার্গারিটার কাছ থেকে অনেক কিছু জেনে ছিলেন তিনি।বইটির প্রায় অর্ধেক জুড়ে  মার্গারিটার কথা আছে।ছবির দেশে,কবিতার দেশে বইটি না পড়লে সনুীল গঙ্গোপাধ্যায় অনেক কিছু অজানা থেকে যাবে।

কাকাবাবু সমগ্র

Kakababu Samagraসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সৃষ্টি কাকাবাবু। ওরফে রাজা রায়চৌধুরী।চরিত্রটির সাথে ছোট বড় প্রায় সবারই পরিচয় আছে।কাকাবাবু চরিত্রটি সৃষ্টি করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।এবং বাংলা সাহিত্য পায় আর একটি অসাধারন চরিত্র।অন্য ডিটেকটিভ চরিত্রের সাথে কাকাবাবুর মিল নেই।কাকাবাবু চরিত্রটিকে আমার মনে হয়েছে অ্যাডভেঞ্চারার।তাকে প্রফেসনাল গোয়েন্দা বলা যাবে না।টাকার বিনিময়ে কিছু করেন না।অন্য ডিটেকটিভদের মত তিনি একাই একশ নন কারন তার একটি পায়ে সমস্যা আছে।তাকে ক্রাচে ব্যবহার করতে হয়।তাই বলে কাকাবাবুকে দূর্বল ভাবার কোন কারন নেই।দুহাতে তার প্রচন্ড শক্তি।আর সাহসের কোন তুলনা হয়না।

মিশর রহস্য কিংবা ককাবাবু ও জলদস্যু কাহিনীগুলো পড়লে বুঝা যায়।গল্পগুলো পড়েছি বলেই পৃথিবীর নানা প্রান্তর ঘুড়তে পেরেছি কাকাবাবুর সাথে।কখনও গিয়েছি হিমালয়ে,কখনও মিশরে, কিংবা আন্দামানের ঘন জঙ্গলে।বইগুলো পড়ার সময় আমার সত্যি মনে হত আমিও আছি কাকাবাবু সাথে।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার ধরনই এমন।পাঠককে গল্পের সাথে এক করে দেন।কাকাবাবুর প্রথম অভিযান গল্পটি পড়লে বুঝা যাবে কি কারনে কাকাবাবু খোঁড়া হলেন।কাকাবাবুর খ্যাতির কথা দেশে এবং দেশের বাইরে সবার জানা।শত্রুরা তাকে ভয় পায়,তার আসাধারন বুদ্ধি এবং অন্তরে অসীম সাহসের জন্য।কাকাবাবু ব্যবহার কিন্তু অমায়িক এবং সবার কাছে সৎজন হিসাবেই পরিচিত।পায়ের অভাব পূরণ করেছে তার ভাইপো সন্তু।কাকাবাবুর সহকারি।অনেক অভিযানে সন্তু সাহায্য করেছে কাকাবাবুকে।অনেক রহস্য সন্তুর সক্রিয় অংশগ্রহন না হলে সমাধান হতো না।উপযুক্ত কেস পেলেই ছুটে যাচ্ছেন কাকাবাবু ও সন্তু।কাকাবাবুর বইগুলো নিয়ে অনেক পরে বের হয়েছে সমগ্র।বর্ণনা বেশি আছে এমন বইপড়তে আমার কখনই ভাল লাগে না।কিন্তু বর্ণনার জায়গায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেতিক্রম।তার লেখার সবথেকে ভালো দিক হচ্ছে বর্ণনা।যেমন তিনি যখন কোন জায়গার বর্ণনা করেন, তখন পাঠকদের চোখের সামনে সে জায়গাটির ছবি ভেসে উঠবে।কাকাবাবু বনাম চোরাশিকারি গল্পে জঙ্গলের যে বর্ণনা সুনীল দিয়েছেন তার কোন তুলনা হয় না।কাকাবাবুকে নিয়ে নতুন করে আর কোন গল্প লিখা হবে না ভাবলেই খারাপ লাগে।যারা অ্যাডভেঞ্চার গল্প ভালোবাসেন তারা পড়তে পারেন কাকাবাবু।