ফ্রাংকেনস্টাইন

Frankensteinমেরী শেলী বয়স যখন মাত্র আঠার তখন তিনি এই বইটি লিখেন। বইটি লিখতে তাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করে ছিলেন তার কবি স্বামী পি বি শেলী। বইটি লিখে মেরী ইতিহাস হয়ে গেলেন বিশ্ব-সাহিত্যে। বিশ্ব-সাহিত্য বাধ্য হলো আজীবন তাকে জায়গা দেওয়ার জন্য। মেরী শেলী আঠারো বছর বয়সে (১৮১৬) উপন্যাসটি লেখা শুরু করে শেষ করেন বিশ বছর বয়সে। অর্থাৎ ১৮১৮ সালে। বইটি প্রকাশের পর পর তুলকালাম শুরু হয় পাঠক সমাজে। শুধু ইংল্যান্ডে নয় সারা বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠে ফ্রাংকেনস্টাইন বইটি নিয়ে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো প্রথম প্রকাশিত বইটিতে লেখিকা শেলীর নাম কোথাও ছিল না। সারা পৃথিবী জুড়ে সাড়া জাগানো রোমহর্ষক ও ভৌতিক এই কাহিনীটি শেলী লিখেছেন তার  স্বামী পি বি শেলীর একটি স্বপ্নের উপর ভিত্তি করে। উপন্যাসটি তৈরি হয়েছে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নামের একজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনই প্রধান চরিত্র বা নায়ক এই কাহিনীতে। বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কেনস্টাইন মৃত মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করার ফরমূলা আবিষ্কার করে। এবং ফরমূলাটি প্রয়োগ করে একটি মৃতদেহের উপর। কিন্তু তার ফরমূলাটি অসম্পূর্ন ছিল, সে কারনে মৃত দেহটি পুনরুজ্জীবিত হয় ঠিকই কিন্তু মানুষ হিসাবে নয়, দানব হিসাব। ভুলক্রমে একটি দানব সৃষ্টি করে ফেলে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবটি শুরু করে একের পর এক হত্যাযজ্ঞ। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীও পার পায় না। দু’শ বছর ধরে পৃথিবীতে অমর কাহিনী হিসাবে টিকে আছে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। 

অশুভ সংকেত-কাজী মাহবুব হোসেন

Oshuvo-Songketপিচাশ কাহিনী সম্ভবত পৃথিবীর সব ধরনের পাঠক কম-বেশি পছন্দ করে। ভয় জিনিসটি সেই আদিকাল থেকে মানুষের মনের মধ্যে বাস করছে। আমার মনে হয় মানুষ ভয় পেতে পছন্দ করে। সবাই না হলেও বেশি ভাগ মানুষ ভয় পেতে এবং ভয় দেখাতে ভালবাসে। আমি এমনও দেখেছি প্রচন্ড ভীতু মানুষও হরর মুভি দেখছে রাতের বেলা একা একা। পিচাশ কাহিনীর একজন একনিষ্ঠ ভক্ত বলা যায় আমাকে। দেশি-বিদেশি অনেক ধরনের পিচাশ কাহিনী পড়া হয়ে গেছে আমার। কিছু ছিল একদম বাজে, কিছু ছিল মোটামুটি ধরনের। আর হাতে গোনা কয়েকটি ছিল ফাটাফাটি। যা সত্যি আমাকে পিচাশ-কাহিনী পড়ার আনন্দ এবং একই সাথে প্রচন্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছে। অশুভ সংকেত (তিনখন্ড একত্রে) সে ধরনের একটি বই। কাজী মাহবুব হোসেনের অনেক বই আমি পড়েছি। কিন্ত তার এই বইটির সাথে অন্যগুলোর কোন তুলনাই হয় না। এক কথায় অসাধারন। মূল কাহিনী লিখেছেন তিন জন লেখক মিলে। তিন জন লেখকের লেখা অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন হবে। কিন্তু কাজী মাহবুব হোসেনের চমৎকার অনুবাদের কারনে পাঠকরা তা বুঝতেই পারবেনা। কাহিনীর শুরুটি খুবই সুন্দর। এক পিশাচ-সাধকদের ফাঁদে পরে একটি সদ্যেজাত শিশু কে দত্তক নেয় রবার্ট র্থন নামের একজন মার্কিন ডিপ্লোম্যাট। নিজের অজান্তে সে ঘরে নিয়ে আসে ভয়ন্কর এক পিচাশ-পুত্রকে। যার নাম ডেমিয়েন। শুরু হয় অশুভ এক পিচাশ কাহিনীর।

যুবক যুবতীরা

যুবক যুবতীরা-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়এই উপন্যাসটি আসলে আমাদের গল্প, আমাদের চারপাশের গল্প, যৌবনের গল্প। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যৌবনে নিজে যা দেখেছেন সেই কথাগুলো পাঠকদের গল্বপের ছলে বলেছেন এই উপন্যাসে। কাছের বন্ধু হয়েও মানুষ একজনের চেয়ে আরেক জন সম্পূর্ন আলাদা। চিন্তা-চেতনায়, অচার-ব্যবহারে সব দিক দিয়ে একেক জন একেক রকম। এই চরিত্রগুলোর কথাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তুলে ধরেছেন এই  উপন্যাসটিতে। উপন্যাসটি যখন তিনি লিখেছিলেন তখনও তিনি আজকের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হয়ে উঠেননি। এটা তার প্রথম দিকের লিখা। প্রথম দিকের লিখা হলেও বইটি পাঠকদের ভাল লাগবে। কারন পাঠকদের মনে হবে উপন্যাসটির চরিত্রগুলো তাদেরই পরিচিত মানুষ। কয়েকজন বন্ধুর গল্প নিয়ে এই উপন্যাসের কাহিনী। তাদের একান্ত নিজস্ব ভাবনা, তাদের ভালবাসা প্রকাশের ভাব, তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পাঠকদের খুব ভাল করে বুঝাতে পেরেছেন। একসাথে থেকেও সবাই আলাদা। একজনের দৃষ্টিভঙ্গি অন্য জনের সাথে মিলে না। থাকে অনেক মতের পার্থক্য। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ে লেখার কারনে প্রতিটি চরিত্রই আলাদা, আলাদা প্রান পেয়েছে। এই উপন্যাসটি যখন তিনি লিখছেন, তখন তার উপন্যাস লিখার তেমন একটা অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি ছিলেন উঠতি একজন কবি। তারপরেও বইটি আমার বেশ ভাল লেগেছে।

থ্রি মিসটেকস অব মাই লাইফ

3-Mistakes-of-My-Lifeথ্রি মিসটেকস অব মাই লাইফ ২০০৮ সালে প্রকাশের পরপরই ইন্ডিয়াতে বইটি হইচই ফেলে দেয়। বিষেশ করে উঠতি বয়সের তরুন-তরুনিের মাঝে। সমাজের প্রায় সকল দিকই উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। কাহিনীটি আহমেদাবাদ শহরটিকে ঘিরে তৈরী করেছেন লেখক। তাই ২০০০-২০০২ সময়কালের মধ্যে আহমেদাবাদ-গুজরাটকে কেন্দ্র করে যেসব উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে, স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। চেতন ভগতকে বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক বলা হয়। অথচ তিনি হিন্দী ভাষায় কোন বই লিখেননি। চেতন এখন পর্যন্ত তিনটি বই লিখেছেন এবং সবগুলোই টিনএজার, তরুণ এবং যুবকদের জন্য লিখা। অনেকই সমালোচনা করে বলে তার লেখার মধ্যে কোন গভীরতা নেই, ভাষাও মার্জিত না। আমার কাছে সে রকম মনেই হয়নি। বরং মনে হয়েছে চেতন তার বইয়ে এই প্রজন্মের অনেক বিষয় তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের গল্প ভারতের আহমেদাবাদ শহরে বেড়ে উঠা তিন বন্ধুর অসাধারন বন্ধুত্বের গল্প। আমার মনে হয়েছে চেতন এই উপন্যাসটিতে সময়কে খুব সুন্দর করে ব্যবহার করেছেন। আনেক সত্য ঘটনা তিনি এনেছেন তার এই উপন্যাসে। আর তাই গল্পটিকে পাঠকদের মনে হবে সত্য কাহিনী। আমার কাছে বইটির সবচেয়ে ভাল দিক মনে হয়েছে সহজ-সরল ভাষা। যা বুঝতে পাঠকদের কোন কষ্ট করতে হবে না। বাংলায় অনুবাদ করেছেন ইশতিয়াক আহমেদ। খুবই ঝরঝরে একটি অনুবাদ। বইয়ের মূল ভাষা বজায় রেখে খুব সুন্দর করে পাঠকদের কাছে বইটি পৌছে দিয়েছেন।

১২ অ্যাংরি মেন

12 Angry Menএক কথায় অসাধারন বলার মত একটি সাসপেন্স মুভি। সাদা-কালো প্রিন্টে ধারন করা মুভিটির বেশি ভাগ দৃশ্য একটি কামরার মধ্যে সীমাবদ্ধ। পরিচালনার গুনে সেই কামরাটিতে যে পরিমাণ উত্তেজনা তৈরি হয়, তা অনেক থ্রিলার মুভিতেও পাওয়া যায় না। লক্ষ লক্ষ ডলার ব্যায় করেও এধরনের ছবি বানানো যায় না। এর জন্য লাগে মেধা, লাগে সৃষ্টিশীলতা। ছবিটির চিত্রনাট্যে দিকে একটু খেয়াল করলেই বুঝা যায় এটি একটি ক্রিয়েটিভ কাজ। কম বাজেটের এই ছবিটি সর্বকালের সেরা ছবি হিসাবে স্থান পায় IMDB সেরা ২৫০ ছবির তালিকায়। দর্শকদের ভাল মুভি দেখার ইচ্ছাকে জাগ্রত করবে এই মুভিটি এবং সিনেমা দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিবে। সাদা-কালো বলে মুভিটি দেখা থেকে কারোই নিজেকে বঞ্চিত করা একদমই ঠিক হবে না। যদি কেউ ৫-৬ মিনিট ধর্য্য ধরে মুভিটি দেখে তাহলে শেষ পর্যন্ত দেখতে বাধ্য হবে। কাহিনী তাকে আটকে ফেলবে অক্টপাসের মত। আর ছুটতে পারবেন না শেষ না দেখা পর্যন্ত। চমৎকার এই মুভিটি কিন্তু মাত্র ৯৬ মিনিটের। দেখা শেষ হলে প্রতিটি দর্শকের মনে হবে কেন এত তারাতারি শেষ হয়ে গেল মুভিটি। অসাধারন কিছু ডায়লগ আছে যা দর্শকদের মন ছুঁয়ে যাবে। কাহিনী শুরু হয়েছে আদালতে, নিজের বাবাকে হত্যা করার জন্য অভিযুক্ত হয় একটি অল্প বয়সি ছেলে। আদালত থেকে ১২ সদস্যের একটি জুরিবোর্ড গঠণ করার নির্দেশ দেয়া হয়, ছেলেটি দোষী নাকি নির্দোষ তা বের করার জন্য। তার পরের কাহিনী আসাধারন। মুভিটি পরিচালনা করেছেন Sidney Lumet।

দ্য গডফাদার

The-Godfatherনিউইয়র্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ইতালীয় মাফিয়া ডন হলো ভিত্তো কর্লিওন ও তার পরিবার।ডনের একমাত্র মেয়ের বিয়ের অথিতিদের তদারকির মাধ্যমে শুরু হয় মুভিটি।ডন ভিত্তো কর্লিওন পুরোনো প্রথায় জীবন-যাপনে বিশ্বাসী এবং পছন্দ করেন।তার পছন্দই পরিবারের শেষ কথা।ডন ভিত্তোর তিন ছেলের মধ্যে একমাত্র মাইকেলেরই যোগ্যতা আছে ডনের অবর্তমানে পরিবারকে নেতৃত্ব দেয়ার।কিন্তু প্রাক্তন সৈনিক ছোট ছেলে মাইকেল বাবার ‘ব্যবসা’ পছন্দ করে না।ডন কর্লিওনের বড় ছেলে সনি সাহায্য করে বাবার সাম্রাজ্য দেখা-শোনায়।তবে সে বাবার কোন গুনই পায়নি।অতি রগচটা এবং মাথা গরম তার।মেঝো ছেলে ফ্রেডো এককথায় অযোগ্য।ডন ভিত্তোকে যারা সম্মান করে তাদের কাছে তিনি অত্যন্ত বিনয়ী এবং প্রচন্ড দয়ালু।অপরদিকে তাদের প্রতি চরমভাবে নিষ্ঠুর যারা তার পরিবারের মঙ্গলের প্রতি বাধা হয়ে দাড়ায়।পুরোনো ঐতির্যকে ধরে রেখে ডন ভিত্তো মাদকের ব্যবসাকে প্রচন্ড ঘৃনা করে।তাই  ডনকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়।পরিবার ও মাফিয়া সাম্রাজ্যের খাতিরে সামনে এগিয়ে আসে ডনের ছোট ছেলে মাইক।১৯৭৩ সালে অস্কারে দশটি নমিনেশ পায় মুভিটি।পুরস্কায় পায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র,শ্রেষ্ঠ অভিনেতা,শ্রেষ্ঠ রূপান্তরিত চিত্রনাট্যে।মুভিটি পরিচালনা করেন ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা।

রচনাসমগ্র

Dale-carnegie-Rachana-Samagযিনি নিজের মন নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন -তিনিই জীবনে বড় হয়েছেন-ডেল কার্নেগীর এই কথাটির সাথে শুধু আমি না অনেকেই একমত হবেন। মানুষের মন তো বিশাল একটি ব্যাপার। মন বলতে অনেক কিছুই বুঝায়। আমাদের বেশিভাগ অনুভুতি মন থেকে সৃষ্টি হয়। যেমন রাগ,লোভ,আনন্দ-হাসি,কান্না-বেদনা ইত্যাদি। লেখক মূলত এই জিনিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছেন। এর মধ্যে রাগ আর জিদ খুবই ক্ষতিকর মানব জীবনের জন্য। ডেল কার্ণেগী জীবনে অনেক লিখা লিখেছেন। যার প্রায় সবগুলোই মানুষকে নিয়ে মানে মানুষের জীবনধারা নিয়ে।  কিভাবে একজন মানুষ তার জীবনকে উন্নত করবে, কিভাবে মানুষ নিজেকে সুখি করবে ইত্যাদি। সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষকে কিছু না কিছু প্রতিভা দিয়ে দুনিয়াতে পাঠান। সেই প্রতিভাগুলো কিভাবে বের করে আনতে হবে এবং কিভাবে ব্যবহার করতে তা খুব সুন্দর করে বলেছেন ডেল কার্নেগী। দুশ্চিন্তা একটি মানসিক রোগ। মানুষকে ধিরে ধিরে শেষ করে দেয় দুশ্চিন্তা নামের এই মানসিক রোগটি। স্লো পয়জনের মত মানুষকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলে। দুশ্চিন্তা করার জন্য মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে খুব তাড়াতারি বুড়িয়ে যায় মানুষ। দুশ্চিন্তা থেকে কি করলে মুক্তি পাওয়া যাবে ছোট ছোট অধ্যায়ে বিস্তারিত লিখেছেন ডেল কার্নেগী। আমাদের সবারই বইটি পড়া উচিত। বইটি পড়লে জীবনের অনেক না জানা দিক প্রকাশ পাবে।

শ্রেষ্ঠ শিবরাম

Sresto-Sebramশিবরাম চক্রবর্তীকে নিয়ে নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। শিবরামকে আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্যের দিকপাল। তাঁর লেখার ধরন তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে দেয়। তাঁর লেখা গল্প ও রম্য রচনা পড়ে রামগরুর ছানাদেরও হাসতে হবে। ছোটদের খুব পছন্দ করতেন তাই ছোটদের জন্য আছে তার অনেক লেখা। শিশু সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে তার লেখা। শিবরামের লেখা ছাড়া বাংলা সাহিত্যের রম্য বিভাগটি অসম্পূর্ন। শ্রেষ্ঠ শিবরাম বইটি শিবরাম চক্রবর্তীর কিছু জনপ্রিয় উপন্যাস,গল্প,কবিতা ও নাটক নিয়ে। সবগুলো লিখাতেই পাঠক প্রচুর আনন্দ পাবেন। কিছু কিছু লাইন পড়ে হাসতে হাসতে আমার মুখ ব্যাথা করেছে। ছোটবেলা আমরা যারা শিবরাম ও অন্যনো লেখকদের বই পড়ে যে আনন্দ পেয়েছি এখনকার বাচ্চারা কি এধরনের আনন্দ পায়? বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই শিবরাম চক্রবর্তীকে চিনেই না। শিবরাম নিয়মিত লিখতেন একথা বললে তার প্রতি বড়ই অবিচার করা হবে। তার বেশি ভাগ লেখাই হঠাৎ করে লেখা। মানে শিবরাম কখনোই ঘটা করে বসে, কাগজ কলম নিয়ে সময় দিয়ে লিখতেন না। তাঁর লেখাগুলো পড়লে পিওর আনন্দ পাওয়া যায়। কোন দুঃখ কষ্টের ভিতর দিয়ে যেতে হয় না। বাস্তব জীবনেও তিনি প্রচন্ড রসিক ছিলেন। শিবরাম চক্রবর্তীকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যর রম্যরচনার অন্যতম প্রবাদপ্রতিম প্রাণপুরুষ।

মেয়েরা যেমন হয়

Meyera-Jemon-Hoyউপন্যাসটির নাম দেখে অনেকের মনে হতে পারে সমরেশ মজুমদার মেয়েদের নিন্দা করছেন বইটিতে, আসলে কিন্তু তা না। মেয়েরা যেমন হয় উপন্যাসটি সমরেশ মজুমদারের ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা শুধু মেয়েদের নিয়ে। জীবন চলার পথে অনেক ধরনের মেয়ের সাথে তাঁর পরিচয় হয়েছ। তারই কিছু কথা তিনি বলেছেন উপন্যাসটিতে। আমার মনে হয়েছে লেখকের সাথে পরিচয় ছিল এমন মেয়েদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন সমরেশ মজুমদার। যেমন- তার কলেজ জীবনের পরিচিত মেয়ে, তার স্কুল জীবনের পরিচিত মেয়ে, তার কর্ম জীবনের পরিচিত মেয়ে ইত্যাদি। এসব মেয়েদের অনেকের ছিল উচ্চ আশা, কারো ছিল নিজের প্রশংসা শুনার শখ ইত্যাদি। এই বইটি পড়লে পাঠকরা বুঝতে পারবে সমরেশ মজুমদারের ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো পাঠকদের অতি পরিচিত। সময়ের সাথে সাথে আমাদের আচরন পাল্টায়, পাল্টে যায় মনোভাব। মানুষ তার মনের জন্যই সৃষ্টির সেরা জীব। সেক্ষেত্রে মন অতি বিশাল ব্যাপার। এতো বিশাল ব্যাপার বোঝার নির্দিষ্ট কোনো উপায় আছে বলে আমি মনে করি না। বইটি অবশ্যই ব্যক্তিগত লাইব্ররীতে রাখার মত।

আমি বীরাঙ্গনা বলছি

Ami-Birongona-Bolchhiবীরাঙ্গনা শব্দটির সাথে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু শব্দটি দিয়ে কি বুঝানো হয় তা অনেকেই জানিনা। বীরাঙ্গনা শব্দের আভিধানিক অর্থ বীর নারী। রাষ্ট্র শুধু বীরদের মনে রাখে বীরাঙ্গনাদের নয়। বীরাঙ্গনাদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরন দেখলে মনে হয় শ্রদ্ধা, শোক, সম্মান-ফুল এসব শুধু বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম আর বীরবিক্রমদের জন্য। বীরাঙ্গনাদের সবসময় এসব থেকে দূরে রাখা হয়েছে। নয় মাসে প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল। তার মধ্যে ২০% ছিল আমাদের মা, বোন অথবা বৌ মানে নারী। তাদের অনেকের বয়স ছিল ১২ বছরের নিচে। ২০% হিসাবে প্রায় ছয় লক্ষ নারী যুদ্ধে শহীদ হয়, আর চার লক্ষ হয় চরম নির্যাতিত। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই দশ লাখ নারী কেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবে না? মুক্তিযুদ্ধের সময় অবদানর জন্য দেশ ৬৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নানা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এর মধ্যে মাত্র দু’জন ছিলেন নারী। কুড়িগ্রামের তারামন বিবি তার বীরপ্রতীক উপাধি পাওয়ার খবর জানতে পারেন ঘটনার ২৪ বছর পর। স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের নারীরা ত্যাগ করেছেন তাঁদের সর্বস্ব। এই ত্যাগের জন্য তার কোন কিছুই চায়নি। এ ত্যাগ কতটা মহৎ তা লিখে বুঝানো যাবেনা। শুধু মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে কখনই একটি দেশ স্বাধীন করা যায় না, বীরাঙ্গনাদেরও লাগে স্বাধীনতার জন্য। ড. নীলিমা ইব্রাহিমের আমি বীরাঙ্গনা বলছি বইটি পড়ে আমি বুঝতে পেরেছি এই বইটি না পড়লে আমি কখনই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারতাম না। বইটি পড়ে জানতে পারলাম রাষ্ট্র এসব বীর নারীদের পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। কিন্তু বীরাঙ্গনারা কখনোই নিজেদের বীরাঙ্গনা বলে পরিচয় দিতে দ্বিধাবোধ করেননি বরং দৃপ্তকন্ঠে বলেছেন হ্যা আমি বীরাঙ্গনা। তাদের প্রপ্প্য সম্মান দিতে না পারার জন্য একজন বাংলাদেশী হিসেবে এ লজ্জা রাখার জায়গা কোথায় আমার? বইটির সত্য ইতিহাস, বীরাঙ্গনাদের নিজের মুখে বলা কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিয়েছে প্রতি পাতায় পাতায়। আমার কাছে আমি বীরাঙ্গনা বলছি বইটিকে শুধু একটি বই মনে হয়নি। মনে হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসর অংশ।এ খনো অনেক বীরাঙ্গনা এই দেশটার জন্য নীরবে চোখের পানি ফেলে। নতুন প্রজন্ম থেকে শুরু করে সবারই বইটি পড়া উচিত।