পিঁপড়াবিদ্যা

pipra-bidyaআপনি যদি হাফ-বুদ্ধিজীবী হন বা যদি মনে করেন সিনেমা হবে সমাজ পরিবর্তনের হতিয়ার অথবা আপনার যদি মনে হয় সিনেমা হলো প্রতিবাদের ভাষা তাহলে আপনার পিঁপড়াবিদ্যা না দেখাই ভাল। এই ছবিতে এমন কিছু নেই। কিন্তু আপনি যদি সিনেমাকে শুধু একটি শিল্পমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন বা বিনোদনের মাধ্যম মনে করেন তবে পিঁপড়াবিদ্যা আপনার জন্যই।

মোস্তফা সারয়ার ফারুকির অনবদ্য সৃষ্টি পিঁপড়াবিদ্যা! আর দশটা সাধারণ চলচ্চিত্রের মতো একটা সম্পূর্ণ কাহিনী নিয়ে পুরো চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়নি। বরং খণ্ড খণ্ড দৃশ্যগুলো একসাথে মিলে তৈরি হয়েছে একটি অসাধারণ কাহিনী। পিঁপড়াবিদ্যার প্রথম স্বকীয়তাটাই এখানে।

মিঠু নামে ছাপোষা মধ্যবিত্ত এক তরুণের জীবনযুদ্ধ ও রিমা নামে এক চলচ্চিত্র তারকার ‘গোপন’ ভিডিও— এই দুই প্রধান ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়  পিঁপড়াবিদ্যার কাহিনী। ছবিতে সমান্তরালভাবে এগিয়ে যায় এই দুই ঘটনা। এই ঘটনাগুলোর সাথে প্রাসঙ্গিক ভাবে চলে আসে আরও কিছু খণ্ড খণ্ড চিত্র। খুবই সাধারণ ঘটনার মাধ্যমেই কাহিনী শুরু হয়। যেন কোন চিরাচরিত ঢাকাই ছবি! দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেও একটা চাকরীর জন্য হন্যে হয়ে ঘুড়তে হয় নায়ককে। কি খুবই পরিচিত একটা ঢাকাই ছবির দৃশ্য তাই না? একটি সাধারণ কাহিনিকে কি করে অসাধারণ করে তোলা যায় তাই দেখিয়েছে পিঁপড়াবিদ্যা। মিঠুর চাকুরী হয় নামসর্বস্ব এমএমএল কোম্পানিতে। তারপর ঘটনাচক্রে এক চোরের মাধ্যমে মিঠুর সঙ্গে উচ্চবিত্ত নায়িকা রিমার সাক্ষাত হয়। কিভাবে? নায়িকার মুঠোফোন চুরি করে চোর মুঠোফোনটি বেচে দেয় মিঠুর কাছে। আর সেই মুঠোফোনে মিঠু  খুঁজে পায় নায়িকার একটি ‘গোপন’ ভিডিও। কি এবার কিছুটা অন্যরকম মনে হচ্ছে তো কাহিনীটা?

এভাবেই রিমা-মিঠুর যোগাযোগ শুরু হয়। কাহিনিও এগোতে থাকে চমৎকার ভাবে। সিনেমার এই পর্যায়ে এসে আপনার মনে হবে পুরোটা না দেখা ওঠা সম্ভব না! মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠা যুবকের মনে প্রতিনিয়ত যে দ্বন্দ্ব কাজ করে তা চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মোস্তফা সারয়ার ফারুকি। কিন্তু তাই বলে পিঁপড়াবিদ্যাকে মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েনের গল্প বলা যাবেনা কোন ভাবেই।  পিঁপড়াবিদ্যা কোন সুনির্দিষ্ট গল্প বলে না, বরং আপনার আমার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলো মানুষের গল্পকে একটি ফ্রেমে বাঁধে  পিঁপড়াবিদ্যা।

হাফ গার্লফ্রেন্ড

half-girlfriendচেতন ভগতের হাফ গার্লফ্রেন্ড বইটি পড়লাম। ইংরেজী ভাষায় এত সহজ করে লেখা যায় চেতন ভগতের লেখা বইগুলো না-পড়লে বুঝতে পারতাম না। সমালোচকরা বলেন চেতন তাঁর লেখায় যে ইংরেজী ব্যবহার করেন তা পুরোটাই অখাদ্য। এমন ইংরেজি জানার চেয়ে না জানাই ভাল। তাঁর বই পড়ে আমার কিন্তু এরকম মনে হয়নি। চেতনের ইংরেজি সহজ, সাধারন এবং তিনি ব্যবহার করেন একদম কমন কিছু ইংরেজী শব্দ। সে কারনে এখনকার যুবক-যুবতি, তরুন-তরুনি বেশিভাগ ছেলে-মেয়ে চেতন ভগতের লেখার ভক্ত। তাঁর লেখা মানেই ভিন্ন কিছু, তাঁর লেখা মানেই ভিন্ন ভাবে সমাজকে অনুভব করা। হাফ গার্লফ্রেন্ড উপন্যাসটিকে নিছকএকটি প্রেম কাহিনী বললে ভুল হবে। এখানে তিনি বিহার রাজ্যের সামাজিক পরিস্থিতি এবং সেখানকার স্থানীয় লোকজনের ইংরেজীতে অদক্ষতার কথাও তুলে ধরেছেন। উপন্যাসটিতে এক তরফা প্রেম দেখানো হয়েছে। রিয়া এবং মাধব নামের দুই বন্ধুর কাহিনী। রিয়া কি সত্যি মাধবকে ভালবেসে ছিল? চেতন এখানে কি বুঝাতে চেয়েছেন? যদি ভালবেসে থাকে তাহলে অন্য আর একজনকে কেন বিয়ে করলো? যাই হোক লেখকের সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল একটি সুখময় সমাপ্তির। রিয়ার মৃত্যু কি অবধারিত? অবধারিত হোক আর না-ই হোক, সকল প্রেম-কাহিনীতেই যে সুখময় সমাপ্তি ঘটবে এটা অবধারিত না। আমার মনে হয়েছে চেতন ভগত উপন্যাসটি এমন ভাবে লিখেছেন যাতে পরে বলিউড ছবির জন্য চিত্রনাট্য তৈরি করতে ঝামেলা না হয়। তাই বইটি পড়ার সময় মনে হচ্ছিল কোন বলিউড সিনেমার গল্প পড়ছি। তবে স্বীকার করতেই হবে উপন্যাসটি খুব সহজ ভাষায় এবং চমৎকার করে লিখেছেন চেতন ভগত।

ডোরা ব্রুডার বা Dora Bruder ( ফ্রেঞ্চ উচ্চারণ দোহা ব্রুদার)

mod

mod-doএক কিশোরীর অকাল মৃত্যুকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে Dora Bruder ( ফ্রেঞ্চ উচ্চারণ দোহা ব্রুদার) উপন্যাসটি। মোদিয়ানোর বিখ্যাত ‘আউট অব দি ডার্ক’ উপন্যাসটির মতো এই উপন্যাসটিও বেশ ছোট। এই উপন্যাসটিও ‘আউট অব দি ডার্ক’ এর মতোই নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে লেখা। কিন্তু Dora Bruder যেন আরো বেশি বিষণ্ণ, আরো বেশি স্মৃতিকাতর।

কনভেন্ট স্কুল থেকে পালিয়ে যাওয়া এক কিশোরীকে খুঁজে বের করার চেষ্টার জটিল এক কাহিনী এটা। এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে যৌক্তিক অনুমান আর আবেগ মিশ্রিত কল্পনা। মোদিয়ানোর এই খুঁজে বেড়ানোর গল্পটা শুরু হয় ১০ বছর আগে, যেদিন সে ১৯৪১ সালের এক পুরনো খবরের কাগজে Dora Bruder  নামে ১৫ বছরের এক কিশোরীর নিখোঁজ সংবাদ দেখতে পায়।

চরিত্র নির্মাণের যে অসাধারণ দক্ষতা মোদিয়ানোকে সমসাময়িক ফরাসী উপন্যাসিকদের থেকে আলাদা করেছে তা ব্যবহার করে মেয়েটির খোঁজে মোদিয়ানো দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, সরকারী-বেসরকারি অফিসে হন্যে হয়ে দলিল দস্তাবেজের পেছনে ছুটেছেন। মেয়েটি এমন এক জায়গা থেকে নিখোঁজ হয়েছে যে জায়গাটিতে ৫০ বছর আগে লেখকের নিয়মিত পদচারনা ছিল। কিন্তু মোদিয়ানো মেয়েটি সম্পর্কে কোন প্রকার তথ্যই পাচ্ছিলেন না। অনেক খেটেখুটে যা পাওয়া গেল তা হচ্ছে ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যে সব জীউস প্যারিস থেকে আউশুইচ (Auschwitz) গিয়েছে তাদের তালিকায় মেয়েটির নাম।

পুরনো খবরের কাগজের সেই বিজ্ঞপ্তি আর এই তালিকাটি ছাড়া মোদিয়ানোর কাছে Dora সম্পর্কে আর কোন তথ্য ছিল না। কিন্তু এইটুকু সম্বল করেই তিনি অতীত খুঁড়ে মেয়েটির হদিশ বের করার চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁর এই নিরন্তর খুঁজে চলার ভেতর দিয়ে নাৎসি অকুপেশনের সময়কার প্যারিসের ভয় আর অনিশ্চয়তার এক পরাবাস্তব দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে! ইতিহাস কে কি করে গল্পের আকারে বলতে হয় তা এই উপন্যাসটি নতুন করে দেখিয়েছে।

মোদিয়ানো এমন একজন লেখক যার লেখা সবার হয়তো ভাল লাগবে না। তাঁকে ও তাঁর লেখাকে কোন একটি নির্দিষ্ট ছকে ফেলা দুষ্কর। তিনি একাধারে বিষণ্ণতার প্রতিচ্ছবি, আবার আশার আলোকবর্তিকা। গল্প বলার স্বতন্ত্র ও স্বকীয় শৈলীই তাঁকে অনন্যসাধারণ করেছে।